Ajker Patrika

সংলাপ-সমঝোতার বিকল্প নেই

মহিউদ্দিন খান মোহন
সংলাপ-সমঝোতার বিকল্প নেই

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে আবারও স্থান করে নিয়েছে সংলাপ প্রসঙ্গ। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নিজ নিজ অবস্থানে ধনুকভাঙা পণ করে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি সচেতন নাগরিকদের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেক আগে থেকেই বিশিষ্টজনেরা দুই পক্ষের মধ্যে একটি অর্থবহ সংলাপ এবং সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমনকি বিদেশি রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী সংস্থাগুলোও রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে সংলাপের বিকল্প নেই বলে অভিমত ব্যক্ত করছে। কিন্তু যাদের ঘিরে এত কথা, তারা এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত রয়েছে বিপরীত মেরুতে।

আওয়ামী লীগ আগাগোড়া বলে আসছে নির্বাচন কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে হবে, তা সংবিধানে বলা আছে। তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার কোনো দরকার পড়ে না। এ-ও বলছে, সংবিধানের বাইরে তারা এক পা-ও যাবে না। অন্যদিকে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি বলছে, সরকার তাদের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলেই আলোচনা হতে পারে।

দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি উক্তি কারও কারও কাছে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলোকবিন্দুর মতো মনে হচ্ছে। ২ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংলাপের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা সংলাপে করতে রাজি আছেন কি না। এরপর আমরা বিবেচনা করব।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট অ্যাজেন্ডা নিয়ে যদি সংলাপ করতে চায়, তাহলে করতে পারে। অযথা কথা বলে কোনো লাভ নেই।’ তিনি এ-ও বলেছেন, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না বলে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

(আজকের পত্রিকা, ৩ জুলাই, ২০২৩) এদিকে পরদিন ৪ জুলাই আজকের পত্রিকার ‘ভোটের সংলাপ চাপে পড়ে মেঠো কথা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার বেশ চাপে আছে। আর এ চাপ যতটা না দেশের মধ্য থেকে তার চেয়ে বেশি আসছে বাইরে থেকে। বাইরের কয়েকটি দেশ বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে কথাও বলেছে। তারা বলছে, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার কথা। আর তা করতে হলে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অংশীদার বিএনপিকে ভোটে আনতেই হবে।

কিন্তু সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রশ্নই ওঠে না।’ ক্ষমতাসীন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান আজকের পত্রিকাকে বলেছেন, ‘রাজনীতিতে সংলাপ যেকোনো সময় হতেই পারে।

আমরা একটা ভালো নির্বাচন চাই। নির্বাচনের জন্য সংলাপ যদি হয়, সেটা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে হতে হবে। আমাদের সঙ্গে হওয়ার কিছু নেই।’

একটি বিষয় হয়তো কারোরই নজর এড়ায়নি, সরকারের মন্ত্রীরা সংলাপ প্রশ্নে একেকজন একেক রকম কথা বলছেন। কেউ সংলাপ হতে পারে বা সম্ভাবনা রয়েছে আভাস দিচ্ছেন, আবার কেউ সংলাপের প্রশ্নই আসে না বলে তা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অপরদিকে বিএনপি রয়েছে এক অবস্থানে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ইস্যুতে কথা বলতেই নারাজ। দলটির নেতারা অবশ্য ধারাবাহিকভাবে বলে চলেছেন, রাজপথে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে এ সরকারের বিদায়ের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দাবি আদায় করে নেবেন। তবে সেটা কত দূর সম্ভব হবে, তা নিয়ে সচেতন মহলে সংশয় রয়েছে যথেষ্ট। কেননা, বিগত বছরগুলোর ‘দুর্বার’ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর বিএনপি এমন কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি, যাতে সরকার তাদের কাছে মাথা নত করবে। বিগত সাড়ে চৌদ্দ বছরের আন্দোলনের খতিয়ান পর্যালোচনা করে এ প্রশ্ন করাই যেতে পারে যে আগামী ছয় মাসে দলটি আন্দোলন কতটা তুঙ্গে তুলতে পারবে?

কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবশালী দেশগুলোর খবরদারি এখন ওপেন সিক্রেট। তারা এ দেশে একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে আগ্রহী। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ওই সব বন্ধুরাষ্ট্রের এই প্রত্যাশাকে সম্মান জানাতেই হয়। কেউ কেউ অবশ্য বিদেশিদের এই মাথা গলানোকে পছন্দ না করলেও অতীত ইতিহাস বলে তারা তা করবেই। কেননা, আমরাই তাদের এ সুযোগটা দিচ্ছি। তারাও সেই সুযোগটা নিচ্ছে।

রাজনৈতিক সংকট আমাদের দেশে নতুন কোনো ব্যাপার নয়। মাঝে মাঝেই এ সমস্যার উদ্ভব হয়, বিশেষ করে সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে। এর মূল কারণ নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে আসতে না পারা। ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। হলে এমন সংকট দেখা দিতে পারত না। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর আন্দোলনরত সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার প্রশ্নে ঐকমত্যে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

যে কারণে সাংবিধানিক জটিলতা সত্ত্বেও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন সম্ভব হয়েছিল। সে সময় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর সমঝোতার মনোভাব ছিল প্রবল। দলীয় সংকীর্ণতা তখন দলগুলোকে আজকের মতো আচ্ছন্ন করেনি। ফলে জাতীয় স্বার্থে, অর্থাৎ গণতন্ত্রের সাবলীল পথচলা নিশ্চিত করতে তারা ছাড় দিতে কার্পণ্য করেনি।

কিন্তু আজ তিন দশক পরে দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। দলগুলো এখন অনেকটাই কৃপণ। সংকীর্ণতার কুয়াশা তাদের এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছে যে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের কী পরিণতি হতে পারে তা দেখতে পাচ্ছে না। যে সমস্যা বর্তমানে বিরাজ করছে, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমঝোতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা। নাহলে সমস্যা যেখানে আছে, সেখানেই থেকে যাবে। আর এক সমস্যা থেকে জন্ম নেবে নানাবিধ সমস্যা।

সংলাপ-সমঝোতা নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ‘টাগ অব ওয়ার’ দেখে আমাদের এলাকার একটি সত্যি গল্পের কথা মনে পড়ছে। সে গল্পটি বলে আজকের লেখার ইতি টানতে চাই। আমাদের বিক্রমপুরের শ্রীনগর উপজেলার সিংপাড়ায় ছিল আধ্যাত্মিক পুরুষ হজরত চাঁন মস্তানের আস্তানা। আর লৌহজংয়ের দিঘলীতে ছিল হজরত কদম আলী মস্তানের (কদম পাগলা) আস্তানা। দুজনই এখন প্রয়াত। তাঁরা দুজন সমপর্যায়ের আধ্যাত্মিক পুরুষ ছিলেন বলে প্রচারিত ছিল। প্রতিবছর পৌষ মাসে কদম পাগলার আস্তানায় তিন দিনব্যাপী ওরস হতো। একবার কদম পাগলা দাওয়াত পাঠালেন চাঁন মস্তানকে। নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যার পর চাঁন মস্তান তাঁর শিষ্যদের নিয়ে উপস্থিত হলেন কদম পাগলার আস্তানার সন্নিকটে। গিয়ে তিনি খবর পাঠালেন, ‘ওকে (কদম পাগলা) গিয়ে বলো আমি ওর বাড়ির কাছে।

ও যেন এসে আমাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যায়।’ শুনে কদম পাগলা বার্তা পাঠালেন, ‘গিয়ে বলো, ও যখন এতটা পথ এসেই পড়েছে, তখন বাকিটুকু চলে আসুক।’ কিন্তু চাঁন মস্তান অনড়, তিনি যাবেন না কদম পাগলা না আসা পর্যন্ত। ওদিকে কদম পাগলাও নিজের সিদ্ধান্তে অটল হয়ে রইলেন। দুই আধ্যাত্মিক পুরুষের শিষ্যরা রাতভর দূতিয়ালি করল। কিন্তু কোনো ফল লাভ হলো না। সকালবেলা চাঁন মস্তান তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ফিরে এলেন নিজের আস্তানায়। দুই পীরের মিলন আর হলো না।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংলাপ প্রশ্নে যেভাবে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে, তাতে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে লৌহজংয়ের দিঘলী গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় কি না, কে জানে!

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

দূরপাল্লার বাসযাত্রায় নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, কোন রুটে কত বাড়ল

৭ দিনের গণভোট প্রচারণার জন্য ১ কোটি টাকা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক: রিফাত রশিদ

বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের জন্য মার্কিন অভিবাসী ভিসা স্থগিত

তেলপাম্পে মিছিল নিয়ে এসে ইউএনওর ওপর হামলা, অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা

হাত-পাবিহীন শিশুর জন্ম: বাবা বললেন ফেলে দিতে, হাসপাতাল করল বিল মওকুফ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত