ব্যাটিংয়ে এত দৈন্যদশা বাংলাদেশের

একসময় ভারতকে বলা হতো ‘দেশের মাঠে বাঘ, দেশের বাইরে বিড়াল’। সেই অপবাদ অনেক আগেই ঘুচিয়েছে ভারত। আর সেটি করতে দেশের বাইরে নিয়মিত জিততে হয়েছে তাদের। বড় শিরোপাও জিতেছে তারা। আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজের ব্যর্থতার পর ‘দেশে বাঘ, বিদেশে বিড়াল’ হওয়ার প্রসঙ্গটা মনে করিয়ে দিলেন টুর্নামেন্টে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা তাওহীদ হৃদয়।
জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানকে নিয়ে আমিরাতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। এই ব্যর্থতা যে ব্যাটারদের জন্য, সেটা নিয়েও প্রশ্ন নেই। এটা মানছেন তাওহীদ হৃদয়ও। এই ব্যর্থতা অকপটে স্বীকারের পরও হৃদয় টেনে আনছেন দেশের মাটিতে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের বীরত্বগাথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে টানা চারটি সিরিজ জয় চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু কারণে-অকারণে সেই সাফল্যের কথা টেনে কি হৃদয় জিম্বাবুয়ে-আফগানিস্তানের বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পণকে ‘হজমযোগ্য’ করে তুলতে চাইলেন?
উত্তরটা ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কই বলতে পারবেন। কিন্তু ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে যেভাবে ঘরের মাঠের সাফল্যকে টেনে আনলেন তিনি, তা শ্রুতিকটু বটে। মিডল অর্ডারে কি ভালো ব্যাটারের অভাব—এমন এক প্রশ্নের উত্তরে হৃদয় বললেন, ‘পুরো ব্যাটিং ইউনিট ব্যর্থ। পাইপলাইনে অবশ্যই যথেষ্ট খেলোয়াড় আছে। বিদেশের সিরিজে ভালো করতে পারছি না। ঘরের মাঠে যে খেলা হচ্ছে, বেশ কিছু সিরিজ বেশ ভালোভাবে জিতেছি। ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে কিছু জায়গায় উন্নতি করতে হবে। বাইরের কন্ডিশনে খেলা হলে, কিছু জায়গা আছে, যেখানে উন্নতি প্রয়োজন।’
কেন বাংলাদেশ ভালো করছে না—এমন আরেক প্রশ্নেও অকারণেই দেশে ভালো করার কথা টেনে আনলেন হৃদয়। বললেন, ‘কেন খারাপ করছি, এত গভীরভাবে চিন্তা করিনি। দুই সিরিজ আগেও আমরা ঘরের মাঠে ভালো খেলেছি। যে প্রশ্ন করেছেন, আমি একমত যে দেশের বাইরে ভালো খেলছি না।’
দেশের বাইরে বাংলাদেশ ভালো খেলছে না, এটা খালি চোখেও দেখা যায়। সর্বশেষ ঘরের মাঠে এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশের ১০ ওয়ানডেতে ব্যাটারদের পারফরম্যান্সের হিসাব কষলে এমন একটা পার্থক্যই চোখে পড়ে—
দেশে ও দেশের বাইরে সর্বশেষ ১০ ওয়ানডেতে রানের পার্থক্য ৪১৪ রান। ইনিংস গড়ে দেশের বাইরে ৪১.৪ রান কম তুলেছেন লিটন দাস-নাজমুল হোসেন শান্ত-তাওহীদ হৃদয়রা। পরিসংখ্যান যা বলছে না, তা হলো দেশের মাটিতে জেতা টানা চার সিরিজেও দলের অস্বস্তির জায়গা ছিল ব্যাটিং। সেই চার সিরিজের প্রতিটিতে ভালো করেছিলেন বোলাররা, বিশেষ করে পেসাররা। কোনো সিরিজেই ব্যাটিং নিয়ে পুরোপুরি তৃপ্তির ঢেকুর তোলার সুযোগ না মিললেও বোলারদের কাঁধেই বন্দুক রেখে পার পেয়েছে দল।
ঘরের মাঠে চারটি ওয়ানডে সিরিজের ১২ ম্যাচের একটিতেও ৩০০ করতে পারেনি বাংলাদেশ। ২৫০-এর বেশি স্কোর ছিল মাত্র পাঁচটি ম্যাচে। চার ম্যাচে দলীয় স্কোর ছিল ২২৫ রানের নিচে। আর বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচগুলোয় তো দুই শও ছোঁয়নি বাংলাদেশ।
দল খারাপ করলে কেন খারাপ করছে, সে প্রশ্ন আসবেই। তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অধিনায়ককে। কিন্তু তাঁর উত্তরের চেয়েও বেশি উত্তর দেওয়া জরুরি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচকদের। দল নির্বাচন কি ঠিক আছে—এমন প্রশ্নে নির্বাচকেরা হয়তো বলবেন, তাঁদের হাতে বিকল্প নেই। কেন নেই—অবধারিতভাবে প্রশ্নটা যাবে বোর্ডের কাছে। ক্রিকেট থেকে কোটি কোটি টাকা আয়, বোর্ডের হাজার কোটির ব্যাংক ব্যালেন্স। কিন্তু ক্রিকেটার তৈরি কিংবা তৃণমূল থেকে মেধাবীদের তুলে আনতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি বোর্ড? নাকি শুধু বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের দিকে বেশি মনোযোগ তামিমের নেতৃত্বাধীন ক্রিকেট বোর্ডের। একটা সিরিজে খারাপ করলে ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়, স্পোর্টিং পিচে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আয়োজনের কথা বলা হয়। কিন্তু কিছুই বদলায় না।
ত্রিদেশীয় সিরিজে ব্যর্থতার পর হৃদয় যখন দেশের মাটিতে ভালো খেলার পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটেন, তখন কপাল ঠুকতেই হয়—আমিরাতে জিম্বাবুয়ে-আফগানদের বিপক্ষে হেরেও দেশের মাটিতে ‘বাঘ’ হওয়ার গল্প শোনা লাগে।
ঘরে সর্বশেষ ১০ ওয়ানডে
রান গড় স্কোর রানরেট
২১৫৩ ২১৫.৩ ৫.২৮
বিদেশে সর্বশেষ ১০ ওয়ানডে
রান গড় স্কোর রানরেট
১৭৩৯ ১৭৩.৯ ৪.৯৩









