Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার নেটওয়ার্কে ভারতের অবৈধ কলসেন্টারগুলোর ভূমিকা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার নেটওয়ার্কে ভারতের অবৈধ কলসেন্টারগুলোর ভূমিকা
Photo: Collected

ফোনকলের শুরুতে ব্যাংক হিসাব ঝুঁকিতে পড়া বা পরিচয় চুরির সতর্কবার্তা দেওয়া হতে পারে। কলকারী নিজেকে কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি বলে পরিচয় দেন। কথোপকথন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি সঞ্চয়ের টাকা তুলে নিতে বা অপরিচিত কারও হাতে সোনা তুলে দিতে রাজি হয়ে যেতে পারেন।

এ ধরনের কিছু ঘটনার পেছনে রয়েছে ভারতের অবৈধ কলসেন্টার। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্তৃপক্ষের আনা মামলাগুলোতে দেখা গেছে, ভারতের কলকারী, সংগঠক ও অর্থদাতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কুরিয়ার এবং অর্থ পাচারকারীদের সংযোগ রয়েছে। তথ্য–প্রমাণ বলছে, বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা এবং ভুয়া প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়ার নামে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করা জালিয়াতির গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকেন্দ্রগুলোর একটি ভারত।

চলতি বছরের ৫ অক্টোবর ঘোষিত একটি মামলা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিনে এক ফেডারেল জুরি ভারতীয় নাগরিক ভবেশ কুমার ঠক্করকে তারবার্তা জালিয়াতি ও অর্থ পাচারসংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। মার্কিন কৌঁসুলিদের ভাষ্য, ভারতের কলসেন্টারভিত্তিক প্রতারকেরা বয়স্ক মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও সোনা হাতিয়ে নিতেন। যুক্তরাষ্ট্রে ওই অর্থ গ্রহণ ও পাচারের সমন্বয় করতেন ঠক্কর।

লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্ক হয়ে অর্থ বিদেশে পাচার করা হতো। কৌঁসুলিরা জানান, ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি প্রতারণালব্ধ অর্থের সঙ্গে ঠক্করের সরাসরি যোগসূত্র ছিল। এই অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত আয় নয়, বরং বৃহত্তর কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর সংযোগের পরিমাণ নির্দেশ করে।

এর দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করা আরেকটি কথিত প্রতারণা চক্রে অঙ্কিত সতীশচন্দ্র পান্ডেকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই। তদন্তকারীরা বলেন, ২০২৪ সাল থেকে গুজরাটের আহমেদাবাদে একটি অবৈধ কলসেন্টার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছিল। কলকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্মকর্তা সেজে ভুক্তভোগীদের বলতেন, শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণে প্রবেশের জন্য তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের টাকা তুলতে, সোনা কিনতে এবং যুক্তরাষ্ট্রে কুরিয়ারের হাতে তা তুলে দিতে প্ররোচিত করা হতো। সিবিআইয়ের হিসাবে, কথিত এই প্রতারণায় ক্ষতির পরিমাণ ৭২ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। ঘটনাটির তদন্ত এখনো চলছে।

এ ধরনের মামলার একটি প্রতিষ্ঠিত ধরন রয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত আহমেদাবাদভিত্তিক কলসেন্টার পরিচালনাকারী হিতেশ মধুভাই প্যাটেলকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন। প্যাটেল ভারতের একাধিক কলসেন্টার পরিচালনা ও অর্থায়নের কথা স্বীকার করেন। এসব কলসেন্টারের মধ্যে এইচগ্লোবালও ছিল। কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের কর ও অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তা সেজে কথা বলতেন। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সহযোগীরা ভুক্তভোগীদের অর্থ সংগ্রহ ও পাচার করতেন।

প্যাটেল তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে প্রতারণার সংলাপ ও পরিচালনাসংক্রান্ত নির্দেশনা বিনিময় করতেন। এই ভূমিকা দেখায়, ফোন করা কর্মীদের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের কাজও ভারত থেকেই পরিচালিত হতো।

বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা দিয়ে একটি অপরাধচক্র কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা যায় না। চক্রটির মালিকানা, অর্থায়ন ও পরিচালন নির্দেশনা ভারত থেকে এসেছে—এমন প্রমাণ থাকলে ভারতকে ওই নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি অনেক শক্তিশালী হয়।

কলসেন্টার মডেলটি ব্যাখ্যা করে, কীভাবে এসব প্রতারণা বড় পরিসরে চালানো সম্ভব হয়। ইংরেজিতে যোগাযোগ এবং টেলিফোনভিত্তিক গ্রাহকসেবা ভারতের বৈধ সেবা অর্থনীতির পরিচিত বৈশিষ্ট্য। অপরাধী চক্রগুলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার ছদ্মবেশ নিতে একই ধরনের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশের অপব্যবহার করতে পারে। এতে ভারতের বৃহত্তর আউটসোর্সিং শিল্পকে দায়ী করা হয় না।

তবে এতে বোঝা যায়, নিয়োগ, তদারকি ও বিশেষায়িত কাজের ব্যবস্থা থাকায় একটি অবৈধ কার্যক্রমও সাধারণ কর্মস্থলের মতো দেখাতে পারে।

২০২৫ সালের আগস্টে ভারতে চালানো একটি অভিযানে শ্রমবিভাজনের এমন চিত্র উঠে আসে। মহারাষ্ট্রের ইগতপুরীর একটি রিসোর্টে ভাড়া নেওয়া স্থানে কথিত ভুয়া অ্যামাজন সহায়তা কার্যক্রমের সন্ধান পায় সিবিআই। কার্যক্রমটির লক্ষ্যবস্তুদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকও ছিলেন। তদন্তকারীরা জানান, অভিযানের সময় সেখানে ৬২ জন কর্মী কাজ করছিলেন। জব্দ করা হয় ৪৪টি ল্যাপটপ ও ৭১টি মুঠোফোন।

কল দেওয়া, তথ্য যাচাই এবং অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করার মতো ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া ছিল। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনায় বিদেশি টেলিফোন নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকারও দরকার হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা ভারতের কয়েকটি কলসেন্টার ও তাদের পরিচালকদের বিরুদ্ধে ইন্টারনেট টেলিফোন সেবাদাতা ই-সম্পর্কের সঙ্গে যোগসাজশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকদের কাছে কয়েক কোটি প্রতারণামূলক ফোনকল দেওয়ার অভিযোগ আনেন।

অভিযোগে কর ও সামাজিক নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা এবং ভুয়া ঋণ প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়। ফোনকলের সংখ্যা থেকে কতজন অর্থ হারিয়েছেন, তা জানা যায় না। তবে টেলিফোন যোগাযোগ বহনকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও কেন নজরদারির আওতায় আনতে হবে, তা এতে স্পষ্ট হয়।

প্রতারণার মূল কৌশল অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জটিলতার চেয়ে জরুরি পরিস্থিতির বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনার ওপর বেশি নির্ভর করে। ভুক্তভোগীকে বলা হয়, তাঁর পরিচয় চুরি হয়েছে, কম্পিউটার হ্যাক হয়েছে বা সঞ্চয় ঝুঁকিতে পড়েছে। কলকারী তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের শর্তে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখান। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাণিজ্য কমিশন বলেছে, প্রতারকেরা মানুষকে দীর্ঘ সময় ফোনে আটকে রাখেন, ভয় বাড়ান এবং স্বজন বা বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ সীমিত করেন।

সঞ্চয় সুরক্ষিত থাকবে বলে বিশ্বাস করে কেউ নিজেই এমন অর্থ স্থানান্তরের অনুমোদন দিতে পারেন, যার মাধ্যমে তাঁর সঞ্চয় চলে যায়। নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিক উদ্বেগকে সতর্কতা ত্যাগের কারণ বানিয়ে ফেলে প্রতারকেরা। অর্থ একাধিক হিসাব বা বিচারব্যবস্থার সীমা পেরিয়ে গেলে তা উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী থাকতে পারেন মেরিল্যান্ডে, কলকারী ভারতে এবং কুরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো স্থানে।

অভিযানের নিয়ন্ত্রক কারা, তা শনাক্তের আগে তদন্তকারীদের এসব অংশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে হয়। কোনো কুরিয়ার গ্রেপ্তার হলে অর্থ সংগ্রহের একটি ধাপ ব্যাহত হতে পারে, কিন্তু কল পরিচালনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এফবিআইয়ের বাল্টিমোর কার্যালয় ঘোষিত যৌথ তদন্তে বৃহত্তর অনুসন্ধানের ফল উঠে আসে। তদন্তে প্রায় ৬৬০ জন মার্কিন অভিযোগকারীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সরকারি কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা এবং প্রযুক্তি সহায়তার নামে জালিয়াতির সূত্র ভারতের কলসেন্টার কার্যক্রম পর্যন্ত পৌঁছায়। ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কার্যক্রমগুলো ভেঙে দেয় এবং কথিত ছয় নেতাকে গ্রেপ্তার করে।

মেরিল্যান্ডের এক কৌঁসুলি তদন্তে চিহ্নিত একটি ভারতীয় কলসেন্টারকে শত শত প্রতারণার কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেন। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্য এসব ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের অঙ্কের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘটনাগুলো দেখায়, ভাড়া করা অফিস, টেলিযোগাযোগ সেবা ও অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের মতো সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অপরাধী চক্রগুলো কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতারণা চালাতে পারে।

বৈধ ব্যবসা ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। একই সঙ্গে বিদেশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি কর্মীকে নির্বিচারে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

এ জন্য বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সন্দেহজনক ব্যবসা আসলে কী করছে, তা যাচাই করা; অস্বাভাবিক কল কার্যক্রম তদন্ত করা; অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা; এবং অন্য দেশের ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট দ্রুত প্রমাণ সংরক্ষণ করা দরকার। সাফল্য শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং সংগঠকদের বিচার, সম্পদ উদ্ধার এবং অপরাধলব্ধ অর্থ ফেরত পাওয়ার ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করা উচিত।

ভারতের ভূমিকা বর্ণনার ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। প্রমাণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের প্রতারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ভারত। তবে এ প্রমাণ থেকে বলা যায় না যে যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের টেলিযোগাযোগ বা অনলাইন প্রতারণার বেশির ভাগই ভারত থেকে হয়। ভারতীয় জনগণ এসব নেটওয়ার্কের জন্য দায়ী—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পদক্ষেপ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগ্রহের প্রমাণ দেয়। বারবার বড় ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত হওয়ার ঘটনা অবশ্য দেখায়, এখনো অনেক কাজ বাকি। সীমান্তপারের ডিজিটাল সেবার বড় সরবরাহকারী হিসেবে এই বাণিজ্যের ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঠেকাতে ভারতের দৃঢ় স্বার্থ রয়েছে।

ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হবে, তা এই চক্রগুলোর অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাদের পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে কি না। একজন কলকারীকে বদলি করা যায়, একটি অফিসও আবার খোলা যায়। সংগঠকদের বিচারের আওতায় আনা, প্রতারণালব্ধ অর্থ উদ্ধার করা এবং তাঁদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা পথগুলো বন্ধ করা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।

লেখক: রিত্তিরং, সিনিয়র ফেলো, দ্য লোটাস সেন্টার ফর ডায়ালগ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত