Ajker Patrika

রোহিঙ্গা ঢল: নয় বছরেও অগ্রগতি নেই প্রত্যাবাসনে

  • ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
  • নয় বছরে একজনকেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি।
মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার
রোহিঙ্গা ঢল: নয় বছরেও অগ্রগতি নেই প্রত্যাবাসনে
ফাইল ছবি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর নয় বছর কেটে গেলেও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বদলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। রাখাইনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৪ সাল থেকে আবারও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নতুন করে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এই নিয়ে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জনে। তাদের মধ্যে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন রোহিঙ্গা। বাকি রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বসবাস করছে।

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা ঢলের পর একই বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ হলেও তা স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

প্রত্যাবাসনে বড় বাধা আরাকান আর্মি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা এখন রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত চলছে। এর মধ্যে রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিতে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে জল ও স্থলপথে থাকা রাখাইনের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তও তাদের দখলে। ফলে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে রাখাইনের যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি তাতে সেখানে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।

সর্বশেষ ১৭ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার বাংলাদেশে থাকা ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না বলেও জানিয়েছে দেশটি। তবে বাংলাদেশের তরফ থেকে এই তালিকা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।’ তাঁর মতে, রোহিঙ্গা সংকট প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোর সমস্যা। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রত্যাবাসনে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বহীন করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ। কাজেই এই পরিচয় অস্বীকারের রাজনীতিকে মোকাবিলা না করে প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগোবে না।’

মিয়ানমার সরকারের প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই জানিয়ে অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে সরকার। তাঁর মতে, প্রত্যাবাসনের গতি অনেকটাই নির্ভর করছে রাখাইনের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর।

ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বাড়ছে চাপ

নয় বছরে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো পরিণত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের কেন্দ্রে। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ বসতিতে জায়গার সংকট, দুর্বল অবকাঠামো, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিধস, বন্যা ও রোগব্যাধির ঝুঁকি প্রতিনিয়তই রয়েছে। চলতি বর্ষাতেও এর ভয়াবহতা দেখা গেছে। গত জুলাই মাসে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসে ১৪ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে আরেকটি বড় উদ্বেগ খাদ্য ও মানবিক সহায়তা। আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি পরিবারভিত্তিক প্রয়োজন বিবেচনায় খাদ্য সহায়তার নতুন কাঠামো চালু করেছে। এতে চরম খাদ্য-অনিরাপদ পরিবারগুলো জনপ্রতি মাসে ১২ ডলার, বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবার ১০ ডলার এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির পরিবার ৭ ডলার সমপরিমাণ সহায়তা পাচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কোনো না কোনো মাত্রায় খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে।

খাদ্য ও মানবিক সংকটের পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলার ওপর প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে।’ গত দুই-আড়াই বছরে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে জানিয়ে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা কোনো রকম শেল্টার বা কোনো কিছু দিতে পারিনি। আমাদের বনাঞ্চল উজাড় করে তাদের জায়গা দিয়েছি।’

এখন আর একজন শরণার্থীর চাপ নেওয়ার অবস্থা বাংলাদেশের নেই জানিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘মিয়ানমারের সরকার হোক কিংবা আরাকান আর্মি হোক তাদের বোঝা উচিত, বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সীমাহীন ধৈর্য দেখিয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত রাখাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে নয় বছর ধরে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত