সড়ক নিরাপত্তা: নিরীক্ষা থাকলেও নেই বাস্তবায়নের তদারকি
• সওজের আওতাধীন বেশির ভাগ সড়কেই নিরীক্ষা হয়নি।
• নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
• দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমে কমে আসার প্রবণতা নেই।
• নিরীক্ষার কার্যকারিতা কিলোমিটারে মাপা যায় না: বিশেষজ্ঞ

সড়কের কোথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি, তা চিহ্নিত করা হয় রোড সেফটি অডিট বা সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষায়। ঝুঁকি দূর করতে করা হয় নানা সুপারিশ। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না বা বাস্তবায়নের ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমছে কি না, তা নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নেই। ফলে সড়কের নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত করার উদ্যোগ থাকলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় রয়েছে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার সড়ক। এর মধ্যে সংস্থাটির রোড সেফটি শাখা থেকে রোড সেফটি অডিট হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটারে, যা সওজের মোট সড়কের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ সড়কে এই শাখার মাধ্যমে একই পরিসরে নিরীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বড় প্রকল্পগুলোর আওতায় আলাদাভাবে নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ২০৯ কিলোমিটারে নিরীক্ষা হয়েছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে উত্তরবঙ্গের রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক প্রকল্পেও অভ্যন্তরীণভাবে নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়েছে।
রোড সেফটি অডিট হলো সড়ক বা সড়ক প্রকল্পের নকশা, নির্মাণ ও ব্যবহার পর্যায়ে নিরাপত্তাঝুঁকি পদ্ধতিগতভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য সম্ভাব্য বিপদ আগেই শনাক্ত করে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা। নিরীক্ষায় সড়কের বাঁক, মোড়, বিভাজক, সাইন-সংকেত, দৃশ্যমানতা ও পথচারী পারাপারের মতো বিষয় পরীক্ষা করে ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগ বা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তা বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু কতগুলো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, তাতে ঝুঁকি কতটা কমেছে এবং কতগুলোর বাস্তবায়ন বাকি রয়েছে, তার নিয়মিত হিসাব রাখার ব্যবস্থা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ব্যয় বৃদ্ধি এড়ানোর মনোভাব এবং নিরীক্ষা করার আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকার কারণে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়।
সওজের রোড সেফটি শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, নকশা প্রণয়ন, নির্মাণকাজ চলা ও সড়ক চালুর পর—এই তিন পর্যায়ে রোড সেফটি অডিট হয়। এর প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগ ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়। তারা অগ্রাধিকার অনুযায়ী সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
নিরীক্ষার পরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাওয়ার একটি উদাহরণ ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে।
আধুনিক এই সড়কে ২০২০-২১ অর্থবছরে রোড সেফটি অডিটের আওতায় পর্যালোচনা করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে একাধিক বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অডিটে চিহ্নিত ঝুঁকি দূর করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সুপারিশগুলো কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে সওজের কর্মকর্তাদের দাবি, এই দ্রুতগতির মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতি এবং নজরদারি না থাকার কারণে।
সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সব সড়কেই রোড সেফটি অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পের সড়কে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের বাইরের সড়কেও অডিট করা হবে। আগে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নই ছিল মূল লক্ষ্য, এখন দুর্ঘটনা কমানো ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অডিটে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত হলে ডিজাইন ইউনিটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী তা তদারকি করেন।’
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অডিটের কার্যকারিতা শুধু কত কিলোমিটার সড়ক পরীক্ষা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। চিহ্নিত ত্রুটি সংশোধন, সুপারিশ বাস্তবায়ন ও ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়টিও যাচাই জরুরি। নির্মাণের আগের মতো চালু হওয়া সড়কেও নিয়মিত নিরীক্ষা দরকার।
দুর্ঘটনা কমছে না
সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ ও প্রচারের পরও দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ধারাবাহিকভাবে কমে আসার প্রবণতা নেই। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০১৪ থেকে গত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত ও ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে ১ হাজার ৩৮১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৩ হাজার ২৯টিতে দাঁড়ায়। ছয় বছরে এই দ্রুতগতির দুই চাকার যানে দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ১১৯ শতাংশ। এ সময়ে এতে প্রাণহানি ১ হাজার ৪৬৩ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬৭১ জনে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সড়কের নকশা ও অবকাঠামোগত ত্রুটির পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, চালকের আচরণ, যানবাহনের কারিগরি মান ও ট্রাফিক আইন অমান্য করা।
এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, সড়ক নিরাপত্তা অডিট যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অডিটের সুপারিশ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হলো কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক নির্মাণের আগে নিরাপত্তা সমীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্মাণের পরও দু-তিন বছর পরপর অডিট করতে হবে। কারণ, সময়ের সঙ্গে সড়কের ঝুঁকিও পরিবর্তিত হয়। দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সারা বছর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি প্রয়োজন।
বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আরমানা সাবিহা হক লিভা বলেন, বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার সমস্যা পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা। এখানে দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, অথচ দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানো জরুরি। দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে সরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তার সাফল্য কতটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে নয়, কতজন মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরেছেন, তা দিয়ে বিচার করতে হবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।









