সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার মিটার উঁচুতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। এই পথ ধরে যখন আপনি হেঁটে চলবেন চারপাশের কুয়াশার চাদর ভেদ করে, মনে হবে—এ যেন মাটির পৃথিবী নয়, অন্য কোনো এক স্বর্গরাজ্য। এখানে ঠিক পায়ের নিচেই ঘন, তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। আর পাহাড়ের সবুজ চূড়াগুলো তার মাঝে যেন এক-একটা ছোট দ্বীপ হয়ে জেগে আছে। জায়গাটি উত্তর ভিয়েতনামের সন লা প্রদেশের শান্ত পাহাড়ি অঞ্চল—তা শুয়া। এত দিন কিছুটা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটি ছিল রোমাঞ্চকর এক নাম। আর সম্প্রতি মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ থাইল্যান্ড বা জাপানের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে এই জায়গাটি। তা শুয়া অর্জন করেছে এশিয়ার সেরা উদীয়মান পর্যটনকেন্দ্রের খেতাব।
মেঘ শিকারে পর্যটকেরা
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দূরের এই দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছাতে সময় লাগে বেশ অনেকটা। কিন্তু পাহাড়ি সর্পিল পথ অতিক্রম করে তা শুয়ায় পৌঁছালে রাস্তার সব ক্লান্তি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় পর্যটকদের। জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই সময়টায় তা শুয়ায় সুন্দর তুলতুলে মেঘের দেখা মেলে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মেঘের সমুদ্রে সূর্যের আলো পড়ে যে মায়াবী রূপ তৈরি হয়, তা দেখতেই দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা সেখানে ক্লউড হান্টিং বা মেঘ-শিকারে যায়।
ডাইনোসরের পিঠে রোমাঞ্চ
শুধু মেঘ নয়, তা শুয়ার প্রতিটি বাঁকেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক একটি বিস্ময়। অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয়দের জন্য এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ডাইনোসরস ব্যাকবোন। ডাইনোসরের পিঠের মতো দেখতে সরু, আঁকাবাঁকা ও খাড়া পাহাড়ি পথ ধরে নিচে শত শত মিটার গভীর উপত্যকার দৃশ্য দেখে রোমাঞ্চপ্রেমীদের গা শিউরে ওঠে। আর যাঁরা সূর্যাস্ত দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের গন্তব্য হওয়া উচিত তিন কিলোমিটার দূরের উইন্ডি পিক বা দিন জিউ। যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় মেঘের রূপ বদল দেখা যায় এক পরম প্রশান্তিতে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এ অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা থাকে। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়টি এ অঞ্চল ট্র্যাকিংয়ের জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ।
কচ্ছপের মাথা আকৃতির শিলাখণ্ড
একটু উঁচুতে গেলে মিলবে ২ হাজার ১২০ মিটার উঁচুতে থাকা টার্টল হেড রক বা কচ্ছপের মাথার মতো আকৃতির এক অদ্ভুত শিলাখণ্ড। সেখান থেকে পুরো পাহাড়ি উপত্যকার প্যানারোমিক ভিউ চোখে পড়ে। আর প্রকৃতিপ্রেমীদের মন ভরাবে প্রায় ১৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত তা শুয়ার প্রাচীন বনাঞ্চল।
প্রকৃতির কোলে এক অজানা রহস্য
প্রকৃতির সঙ্গে তা শুয়ার সংস্কৃতির বন্ধনও বেশ চমৎকার। পাহাড়ের ঢালে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন শান তুয়েত চা-গাছ এবং স্থানীয় হমং জনগোষ্ঠীর বাস। নীল রঙের পোশাক পরা হমং কারিগরদের ঐতিহ্যবাহী তাঁত বোনা, মোম দিয়ে কাপড়ে নকশা করা এবং তাঁদের দৈনন্দিন সাধারণ জীবনযাত্রা এই অঞ্চলে নিয়ে আসে এক টুকরো আদিম ও প্রথাগত স্পর্শ। হৈ আন বা হা লং বের মতো বাণিজ্যিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোর চেয়ে তা শুয়া একেবারেই আলাদা। এর আসল আকর্ষণ হলো এর মেকআপহীন রূপ। এখানে দেখা মেলে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, ভাসমান কুয়াশা ও পাহাড়ের চূড়ায় হারিয়ে যাওয়া মেঘের সমুদ্রের। শহর থেকে দূরে কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশে মেঘ ছুঁয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে তাই তা শুয়া হতে পারে আপনার জীবনের অন্যতম সেরা এক ভ্রমণের অধ্যায়।
সূত্র: ভিয়েতনাম ট্যুরিজম, এন ভলস










