ছুটির দিনে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত আপনজনের মুখে হাসি ফোটাবেন যেভাবে

পরিবারের কোনো সদস্য যখন দুরারোগ্য বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যধিতে আক্রান্ত হন, তখন কেবল তাঁর শরীর নয়, মনের ওপর দিয়েও এক বিশাল ঝড় বয়ে যায়। কিডনি ফেইলর, ক্যানসারসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা যা আর ভালো হওয়ার নয় এমন রোগে আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের চাই বাড়তি যত্ন। কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে হয়তো চাইলেও দীর্ঘসময় তাঁদের সঙ্গে কাটানো সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি হতে পারে একটি দারুণ সুযোগ। একটুখানি সময়, যত্ন আর ভালোবাসা তাঁদের এই কঠিন লড়াইয়ে জোগাতে পারে অফুরন্ত মানসিক শক্তি। অসুস্থ আপনজনের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ছুটির দিনে যেভাবে তাঁদের পাশে থাকা যায়, তা নিয়ে কিছু কথা জেনে রাখতে পারেন।

গল্প করেই কাটান কিছু সময়
অসুস্থতার দিনগুলোতে মানুষ প্রায়ই একাকিত্বে ভোগেন, বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠরা। ছুটির দিনের অলস দুপুরে একসঙ্গে বসে পুরোনো ছবির অ্যালবাম খুলে বসতে পারেন। ফেলে আসা দিনগুলোর মজার কোনো ঘটনা, পারিবারিক উৎসব বা তাঁদের তরুণ বয়সের কোনো সাফল্যের গল্প নতুন করে শুনুন। অতীতের ভালো সময়গুলোর রোমন্থন তাঁদের বর্তমানের কষ্টকে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেবে এবং মনের ভেতর এক ধরনের আত্মতৃপ্তি এনে দেবে।
বইয়ের পাতা আর সুরের মূর্ছনা
যদি অসুস্থতার কারণে রোগী নিজে বই পড়তে না পারেন, তবে তাঁর বিছানার পাশে বসে তাঁর পছন্দের কোনো উপন্যাস, কবিতা বা গল্প পড়ে শোনাতে পারেন। এ ছাড়া মৃদু শব্দে তাঁর প্রিয় কোনো গান বা সুর বাজিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সুরের এক অদ্ভুত নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে, যা মানসিক ক্লান্তি দূর করে মনকে শান্ত করে।
প্রকৃতির সান্নিধ্য ও খোলা হাওয়া
একটানা চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থাকলে যে কারও মন বিষণ্ন হয়ে উঠতে পারে। যদি চিকিৎসকের অনুমতি থাকে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা সহায়ক হয়, তবে বিকেলের দিকে তাঁকে ঘরের বারান্দায়, ছাদে বা বাড়ির সামনের ছোট বাগানে নিয়ে যান। হুইলচেয়ারে করে বা হাত ধরে একটুখানি হাঁটিয়ে খোলা হাওয়ায় বসতে দিলে তাঁরা প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ অনুভব করতে পারেন। হালকা রোদ আর মৃদু বাতাস তাঁদের রোগাক্রান্ত শরীর ও মন দুটোকেই সতেজ করে তুলবে।

সৃজনশীল ঘরোয়া আনন্দ
শারীরিক ধকল কম হয় এমন কিছু ছোটখাটো কাজে তাঁদের যুক্ত করতে পারেন। যেমন একসঙ্গে বসে কোনো হালকা ধাঁধার সমাধান করা, দাবা বা লুডু খেলা, কিংবা খুব সহজ কোনো হাতের কাজ বা ড্রয়িং করা। এমনকি সবাই মিলে একসঙ্গে বসে কোনো ভালো মানের সিনেমা বা পারিবারিক নাটক দেখাও হতে পারে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। এতে তাঁরা নিজেদের পরিবারের একটি সক্রিয় অংশ বলে মনে করবেন।
পছন্দের খাবার তৈরি করুন
অসুস্থতায় অনেক সময় মুখের রুচি চলে যায়। যদি চিকিৎসকের কোনো কড়া নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তবে তাঁর পছন্দের কোনো সাধারণ পদ বা নাশতা তৈরি করতে পারেন। রান্না শেষে সবাই মিলে রোগীর ঘরের ভেতরে বা খাবার টেবিলে একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে খাবারটি উপভোগ করুন। এই পারিবারিক আবহাওয়া তাঁদের খাওয়ার আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নীরব সহমর্মিতা ও স্পর্শের জাদু
সব সময় যে অনেক কথা বলতে হবে বা অনেক কিছু করতে হবে, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো স্রেফ পাশে গিয়ে বসা, পরম মমতায় তাঁর হাতটি ধরে রাখা কিংবা মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া হাজারো কথার চেয়ে বেশি কাজ করে। এই নীরব উপস্থিতি রোগীকে বোঝায় যে, পরিস্থিতিতে যাই হোক না কেন, তিনি একা নন—পরিবার সব সময় তাঁর পাশে আছে।
দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা হয়তো দীর্ঘমেয়াদি। তাই রোগীর মানসিক শক্তি বজায় রাখার দায়িত্ব সম্পূর্ণ পরিবারের। ছুটির দিনের এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো তাঁদের জীবনের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। মনে রাখবেন, ওষুধের চেয়েও অনেক সময় প্রিয় মানুষের আন্তরিক হাসি আর একটুখানি ভালোবাসাই হতে পারে তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় পথ্য।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি









