সহিংসতার অদৃশ্য রূপ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে

কোনো নারী যখন বিবাহ-বিচ্ছেদের পথে হাঁটেন; তখন পরিচিত-পরিজনেরা নানান কথার পাশাপাশি একটি কথা বলেন, ‘ভালোই তো ছিলে, এটুকু মানিয়ে নিতে পারলে না? অনেকের জীবনসঙ্গী তো গায়ে হাত পর্যন্ত তোলে। কেন বেরিয়ে এলে সম্পর্ক থেকে?’ কোনোভাবেই যেন বোঝানো যায় না গ্যাসলাইটিং কী বিষয়। না বোঝানো যায়, জীবনটা ডিমের খোসার ওপর হাঁটার মতো জটিল হয়ে উঠেছে। যত সাবধানেই হাঁটা হোক না কেন, ভাঙবেই! ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক সহিংসতা বলতে আমরা শুধু বুঝি শারীরিক নির্যাতনকেই। কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও সেখানে সীমাবদ্ধ নেই।
চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও এমন অনেক আচরণ রয়েছে, যা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা পারিবারিক সহিংসতার অন্তর্গত। অনেকে মনে করেন আঘাত বা মারধর না করলে সেটি নির্যাতন নয়, কিন্তু আইনি এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অবমাননাকর বা ক্ষতিকর যেকোনো আচরণই এর অন্তর্ভুক্ত।’
চলছে অক্টোবর মাস। প্রতিবছর এ মাসকে পারিবারিক সহিংসতা সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। সম্পর্ক বা সংসারে ঘটা যেকোনো ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে, সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করতে এবং ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে এই মাস উৎসর্গ করা হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসে ১৯৮৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মাসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
চোখে দেখা যায় না, তবুও সহিংসতা
ডা. সানজিদা শাহরিয়া জানান, পারিবারিক সহিংসতা প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত। সেগুলো হলো—
মানসিক ও আবেগীয় নির্যাতন
শারীরিক আঘাতের চেয়ে এটি অনেক সময় বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
গ্যাসলাইটিং
ভুক্তভোগীকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করা, যাতে সে নিজের স্মৃতি, বুদ্ধি বা মানসিক সুস্থতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করে। যেমন তুমি মানসিক রোগী; ভুক্তভোগীকে ভুল প্রমাণের চেষ্টা, এটা ঘটেনি; ঘটনা ঘটার পরও ভুক্তভোগীকে মিথ্য়াবাদী বলা।
ক্রমাগত অপমান ও অবমূল্যায়ন সবার সামনে বা আড়ালে প্রতিনিয়ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, কটু কথা বলা বা চেহারা, গায়ের রং ও যোগ্যতা নিয়ে খোঁটা দেওয়া।
হুমকি দেওয়া
ডিভোর্স দেওয়ার, সন্তানকে কেড়ে নেওয়ার বা ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের ক্ষতি করার ভয় দেখানো।

আবেগের অপব্যবহার
কোনো ভুল না থাকলেও অপরাধবোধ তৈরি করা এবং নিজের অন্যায় ঢাকতে ভুক্তভোগীকে দায়ী করা।
অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতন
কারও সম্পদ ও জমানো টাকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ খাটিয়ে কাউকে পরাধীন করে রাখাও এই নির্যাতনের অংশ। কারও টাকা-পয়সা আটকে রাখা ও দৈনন্দিন খরচের বা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা না দেওয়া বা তীব্র হিসাব চাওয়া। উপার্জনে বাধা সৃষ্টি করা। পাশাপাশি চাকরি বা ব্যবসা করতে না দেওয়া, অথবা চাকরি করলেও সেই বেতনের পুরো টাকা জোর করে কেড়ে নেওয়া। এ ছাড়া নিজের নামে থাকা সম্পত্তি বা উপহার হিসেবে পাওয়া জিনিসপত্র জোরপূর্বক দখল করা।

সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ
ভুক্তভোগীকে চারপাশের পৃথিবী থেকে আলাদা করে সম্পূর্ণ একা করে ফেলা। ব্যক্তির নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া বা দেখা করতে বাধা দেওয়া। সারাক্ষণ নজরদারি করাও সহিংসতার অংশ। যেমন সব সময় ফোন চেক করা, কার সঙ্গে কথা বলছে, তা নিয়ে সন্দেহ করা এবং ঘরের বাইরে যেতে হলে প্রতিটি পদক্ষেপের অনুমতি নিতে বাধ্য করা।
যৌন নির্যাতন ও জোরজবরদস্তি করা
বিবাহিত বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে থাকলেও যেকোনো অসম্মতিমূলক আচরণ এর অন্তর্ভুক্ত। বৈবাহিক ধর্ষণ এর একটি বড় উদাহরণ। সঙ্গীর অনিচ্ছা বা শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। এমন কোনো আচরণ বা যৌন কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা, যাতে অপর পক্ষ অস্বস্তি বোধ করে।
ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘এসব ব্যাপার খালি চোখে দেখা না গেলেও দিনের পর দিন ঘটতে থাকলে ব্যক্তি নানারকম ডিসঅর্ডারে ভুগতে শুরু করেন। কিন্তু যেহেতু এগুলোকে এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে শুধু পারিবারিক বোঝাপড়ার বিষয় হিসেবে গণ্য, তাই অনেকে এমন নির্যাতনের শিকার হন। স্কুলের পাঠ্যবইসহ নানা মাধ্যমে এ ধরনের নির্যাতন সম্পর্কে তথ্য প্রচার করা জরুরি। তাহলেই সচেতন হওয়া সম্ভব হবে।’
সূত্র: সাইকোলজি টুডে ও অন্যান্য









