মেঘের সমুদ্র আর আধ্যাত্মিকতার সংযোগস্থলে ভিয়েতনামের ‘বা ডেন’

দক্ষিণ ভিয়েতনামের সমতল ভূমির বুক চিরে ৯৮৬ মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে ‘বা ডেন’ পর্বত। দেশটির তাই নিন প্রদেশে অবস্থিত এই পর্বতটি কেবল তার প্রাকৃতিক নৈসর্গিক রূপের জন্যই নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও মেঘের অপূর্ব খেলা দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ভোরের সূর্যোদয়ের সময় যখন পাহাড়ের চূড়া ঘিরে সাদা মেঘের বলয় তৈরি হয়, দূর থেকে এটিকে দেখতে অবিকল জাপানের বিখ্যাত ‘মাউন্ট ফুজি’-র মতো মনে হয়। তাই স্থানীয়রা ভালোবেসে এটিকে ভিয়েতনামের মাউন্ট ফুজি বলে থাকেন।

মেঘের টুপি ও রূপকথার ক্যানভাস
বা ডেন পর্বতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর চূড়াকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশেষ ‘ক্লাউড ক্যাপ’ বা মেঘের টুপি। ভোরে চারপাশের আর্দ্র বাতাস পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে ওঠে। তখন পর্বতচূড়ায় টুপি বা বলয়ের মতো ঘন মেঘ জমে ওঠে। কখনো কখনো এই মেঘের সীমানা এতই স্পষ্ট হয় যে, মনে হয় কেউ পাহাড়ের মাথায় মেঘের টুপি পরিয়ে দিয়েছে। আবার কখনো সূর্যোদয়ের আলো ফুটতেই সাগরের ঢেউয়ের মতো মেঘের আস্তরণ আছড়ে পড়ে সমতলের সবুজ ধানক্ষেত আর গ্রামগুলোর ওপর। পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য রয়েছে আধুনিক ক্যাবল কার ব্যবস্থা। ক্যাবল কারের কাচের জানলা দিয়ে তাই নিনের বিস্তৃত প্রান্তর দেখার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই কুয়াশা ও মেঘের দল ক্যাবল কারের কেবিনকে ছুঁয়ে যায়, যা পর্যটকদের নিয়ে যায় এক পরাবাস্তব জগতে।
বুদ্ধমূর্তি ও শতাব্দীর প্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য
জাপানের মাউন্ট ফুজি আগ্নেয়গিরির শঙ্কু। কিন্তু বা ডেন পর্বত তেমন নয়। ট্রপিক্যাল সবুজ বনাঞ্চলের এই পাহাড়টি মূলত দক্ষিণ ভিয়েতনামের আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্র। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘নুই বা’ নামেও পরিচিত। পাহাড়ের ঢাল থেকে চূড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক প্যাগোডা ও বিশাল সব বৌদ্ধ স্থাপত্য। পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত বিশালাকার বুদ্ধমূর্তি তৈ বো দা সন। এর চারপাশে যখন মেঘ ভেসে বেড়ায়, তখন এক অদ্ভুত শান্ত ও পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া এখানে আছে বেলেপাথরে তৈরি মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি। এটি কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেলে মনে হয় এক অদৃশ্য জগতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন দর্শনার্থীরা। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত লিন সান তিয়েন থাচ প্যাগোডা এবং ‘দিয়েন বা’ মন্দিরটি স্থানীয় দেবী ‘লিন সান থান মাউ’-এর উদ্দেশে উৎসর্গী করা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুণ্যার্থীরা এখানে ধূপ জ্বালিয়ে পরিবার ও জীবনের শান্তির জন্য প্রার্থনা করে আসছেন।

উৎসব ও আধুনিক পর্যটনের মেলবন্ধন
প্রতিবছর চন্দ্র বছরের শুরুতে বা ডেন পর্বতে অনুষ্ঠিত হয় বসন্ত উৎসব। এ ছাড়া পঞ্চম চন্দ্র মাসে দেবী লিন সান থান মাউয়ের বার্ষিক পূজায় সমগ্র ভিয়েতনাম থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও পর্যটকের সমাগম ঘটে। বিশেষ উৎসবের রাতে হাজারো ভাসমান লণ্ঠন জ্বালিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি অত্যন্ত মনোরম। ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের পাশাপাশি বর্তমানে পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক বৌদ্ধ প্রদর্শনী কেন্দ্র, দৃষ্টিনন্দন পাবলিক প্লাজা এবং নানা রঙের ফুলের বাগান। প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি মেঘের টুপি, আধুনিক ক্যাবল কারে ভেসে চলা এবং প্রাচীন বৌদ্ধ প্রার্থনার সুর—সব মিলিয়ে তাই নিনের বা ডেন পর্বত প্রকৃতির রূপ আর মানুষের বিশ্বাসের এমন এক মিলনমেলা, যা প্রতিটি ভ্রমণকারীর মনে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকে।
কখন যেতে পারেন
বা ডেন পর্বত ভ্রমণের জন্য বছরের সময়গুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী সেরা সময় বেছে নিতে পারেন।
শুষ্ক মৌসুম (নভেম্বর থেকে এপ্রিল): এই সময়টি বা ডেন পর্বত ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আদর্শ ও জনপ্রিয়। এ সময় আবহাওয়া রৌদ্রোজ্জ্বল থাকে, বৃষ্টিপাত খুব কম হয় এবং আকাশ পরিষ্কার থাকে। ফলে কেব্ল কার রাইড, পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ এবং ছবি তোলার জন্য এটি সেরা সময়। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা ও মনোরম থাকে। এ সময়ে ভিয়েতনামের ঐতিহ্যবাহী বসন্ত উৎসব ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ফলে এ সময় সেখানের পরিবেশ বেশ প্রাণবন্ত থাকে।
বর্ষাকাল (মে থেকে নভেম্বর): আপনি যদি পাহাড়ের অন্য রূপ দেখতে চান, তবে এই সময়ে চারপাশ অত্যন্ত সবুজ ও সতেজ থাকে। বিশেষ করে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে পাহাড়ে মেঘের খেলা এবং চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন এক রোমান্টিক পরিবেশ দেখা যায়। তবে বর্ষাকালে হঠাৎ বৃষ্টি বা পাহাড়ি পথে পিচ্ছিল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তাই ট্র্যাকিং করতে চাইলে এ সময় একটু সতর্ক থাকতে হয়। ঝামেলাহীন ও পরিষ্কার আবহাওয়ায় ভ্রমণের জন্য ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসই বা ডেন পর্বত যাওয়ার সেরা সময়।










