Ajker Patrika

টিআইএন থেকে আয়কর রিটার্ন, তরুণদের যা জানা জরুরি

হাসানুর রহমান
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯: ০১
টিআইএন থেকে আয়কর রিটার্ন, তরুণদের যা জানা জরুরি

আয় শুরু করলেই কিছু করসংক্রান্ত দায়িত্ব সামনে আসে। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা বা স্টার্টআপ যা-ই হোক, টিআইএন, কর ও রিটার্ন নিয়ে নানা ভুল ধারণার কারণে অনেক তরুণ বিষয়টি শুরুতে এড়িয়ে যান। কেউ ভাবেন টিআইএন নিলেই কর দিতে হবে, কেউ ভাবেন আয় কম হলে কোনো দায়িত্বই নেই। বাস্তবে আয়ের পরিমাণ, উৎস, পেশা বা ব্যবসার ধরন এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর করসংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ভর করে। তাই আয়ের শুরু থেকে কর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিয়মিত হিসাব রাখা জরুরি।

ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসা

ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল সেবা ও স্টার্টআপের প্রবণতা তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে। কেউ ঘরে বসে দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজস্ব ওয়েবসাইটে পণ্য বিক্রি করছেন। তবে সবার আয় ও কার্যক্রম এক নয়, ফলে হিসাবরক্ষণ ও কর ব্যবস্থাপনাও এক নয়। তাই শুধু অনলাইনে আয় করেন, এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে সবার জন্য একই করব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

টিআইএন কেন প্রয়োজন?

টিআইএন (ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রদত্ত ১২ ডিজিটের একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর। বিভিন্ন সরকারি, ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রমে এটি লাগতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা এক নয়; পেশা, আয়, কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর তা নির্ভর করে। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিআইএন না নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি টিআইএন নেওয়াকে সরাসরি আয়কর দেওয়ার সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়।

টিআইএন থাকলেই কি কর দিতে হয়?

এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। টিআইএন হলো করদাতাকে শনাক্ত করার নম্বর, আর আয়কর হলো করযোগ্য আয়ের ওপর আরোপিত কর। কারও টিআইএন থাকলেও করমুক্ত সীমা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তাঁর প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই টিআইএন নেওয়ার পর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা জেনে নেওয়া দরকার।

ফ্রিল্যান্সারদের আয় ও কর

ফ্রিল্যান্সাররা নিজেদের দক্ষতা ও পেশাগত সেবা দিয়ে আয় করেন। তাই শুরু থেকে আয়-ব্যয়ের সঠিক রেকর্ড রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণযোগ্য নথির মধ্যে রয়েছে—ক্লায়েন্টের সঙ্গে চুক্তি বা কাজের রেকর্ড, ইনভয়েস ও পেমেন্টের রেকর্ড, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের তথ্য এবং পেশাগত খরচের বিল ও রসিদ।

বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে অর্থ নিলে অর্থের উৎস, কাজের প্রকৃতি ও অর্থ গ্রহণের রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখতে হবে। ব্যক্তিগত ও পেশাগত লেনদেন আলাদা রাখলে বছর শেষে হিসাব ও রিটার্ন তৈরি সহজ হয়। কোনো আয় করমুক্ত কি না বা বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

উদ্যোক্তাদের কর ব্যবস্থাপনা

ব্যবসা ছোট হলেও সেটি ব্যবসা। তাই শুরু থেকে আর্থিক হিসাব আলাদাভাবে রাখা উচিত। পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, কাস্টমারের পেমেন্ট, ডেলিভারি ও বিজ্ঞাপন খরচ, কর্মচারীর বেতন, অফিস বা গুদাম ভাড়াসহ সব ব্যয়ের নথি সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যক্তিগত অর্থের সঙ্গে ব্যবসার অর্থ মিশে গেলে প্রকৃত আয়-ব্যয় নির্ধারণ কঠিন হয় এবং রিটার্ন প্রস্তুতে জটিলতা তৈরি হয়। সম্ভব হলে ব্যবসার জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব, অন্তত পৃথক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা ভালো।

করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হয়?

শুধু মোট আয়ের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ হয় না। আয়ের প্রকৃতি, করমুক্ত সীমা, অনুমোদিত ব্যয়, কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করে করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর ঠিক করা হয়। যথাযথ নথি না থাকলে কোনো

ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই আয় ও প্রাসঙ্গিক ব্যয়, উভয়ের প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।

উৎসে কর: অনেক ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তার আয় থেকে উৎসে কর কর্তন হতে পারে। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় এই কর্তিত করের তথ্য উপস্থাপন ও সমন্বয় করতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান বা ক্লায়েন্ট কর কেটে রাখলে তার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে রাখুন।

রিটার্ন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের প্রক্রিয়া। এটি শুধু কর পরিশোধের মাধ্যম নয়, করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক নথিও। যাঁদের আইন অনুযায়ী রিটার্ন দিতে হয়, তাঁদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা দাখিল করা উচিত।

কর না থাকলেও কি রিটার্ন লাগে?

‘আমার কর আসে না, তাই রিটার্ন দেব না’, এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। প্রদেয় কর শূন্য হলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই শুধু কর দিতে হবে কি না তা জানাই যথেষ্ট নয়, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না সেটিও নিশ্চিত হতে হবে।

কর সুবিধার ক্ষেত্রে সতর্কতা

ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার সময়ে সময়ে কর সুবিধা বা অব্যাহতি দিয়ে থাকে। তবে কোনো আয় এসব সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা আইন ও বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। কোনো আয়কে ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা বা প্রযুক্তি খাতের আয় বললেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন ও সংশ্লিষ্ট সময়ের আইন বিবেচনা করেই তা নির্ধারণ করতে হবে।

রিটার্ন দাখিলের আগে কী প্রস্তুত রাখবেন?

রিটার্নের আগে সারা বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে রাখুন। ফ্রিল্যান্সার: ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের রেকর্ড, ইনভয়েস, চুক্তিপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের রেকর্ড ও পেশাগত খরচের প্রমাণপত্র।

উদ্যোক্তা: ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব, চালান,ব্যবসায়িক খরচের বিল ও ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ের রেকর্ড। উভয়ের ক্ষেত্রে: জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণসহ সম্পদ ও দায়ের তথ্য এবংউৎসে কর কর্তনের প্রমাণপত্র।

শুরু থেকেই হিসাব রাখুন

আয় শুরুর দিন থেকেই হিসাব রাখার অভ্যাস করুন। প্রতি মাসে আয়-ব্যয় লিখে রাখুন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ইনভয়েস, বিল, ভাউচার ও রসিদ সংরক্ষণ করুন এবং অনলাইন লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ডও যত্ন করে রাখুন।

শুরুতেই সচেতনতা, ভবিষ্যতে স্বস্তি

ফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য শুধু কত টাকা আয় করছেন তার ওপর নির্ভর করে না। সেই আয় কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

হাসানুর রহমান, অ্যাডভোকেট ও আয়কর আইনজীবী, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত