Ajker Patrika

ডিগ্রি নাকি দক্ষতা—কোনটি জরুরি

জি এম ফরিদ হোসেন
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭: ৪৮
ডিগ্রি নাকি দক্ষতা—কোনটি জরুরি

বর্তমান চাকরির বাজারে একাডেমিক ডিগ্রি অপরিহার্য। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। নিয়োগদাতারা এখন এমন প্রার্থী খোঁজেন, যিনি জ্ঞানকে বাস্তব কাজে লাগাতে পারেন, সমস্যার সমাধান করতে পারেন, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন এবং টিমকে নিয়ে ভালো ফল আনতে পারেন। একাডেমিক ডিগ্রি ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢোকার টিকিট মাত্র। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সনদকে একমাত্র পুঁজি ভাবা হয়। বিস্তারিত লিখেছেন এসিআইয়ের কনজ্যুমার ডিজিটাল বিজনেসের হেড অব সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন জি এম ফরিদ হোসেন।

ধরুন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি পদের জন্য প্রায় ১০০ আবেদন জমা পড়ল। প্রায় সবার ডিগ্রি একই রকম, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর, ফলও ভালো। অথচ সাক্ষাৎকারে ডাক পেলেন হাতে গোনা কয়েকজন, আর চাকরিটা গেল একজনের ঝুলিতে। প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে সমান যোগ্য হয়েও একজন কীভাবে অন্যদের ছাড়িয়ে যান?

বাস্তবে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র। গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণা বলছে, দেশের বৃহত্তম অনলাইন চাকরির পোর্টালে এখন প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন আবেদন করছেন। করোনা মহামারির আগের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ছিল গড়ে ১৭৩ জন। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। এই ভিড়ে এগিয়ে থাকার উত্তর সহজ, কিন্তু অনেকেই তা বুঝতে দেরি করে ফেলেন। ডিগ্রি আপনাকে চাকরির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। সেই দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকা, টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার কাজটা করে দক্ষতা।

ডিগ্রি কেন এখনো জরুরি

দক্ষতার কথা বলার অর্থ এই নয় যে ডিগ্রির মূল্য কমে গেছে। দেশের চাকরির বাজারে এখনো বহু পদে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক। সরকারি চাকরি, ব্যাংক কিংবা বহুজাতিক কোম্পানি সর্বত্র আবেদনের প্রথম ধাপে ডিগ্রি ও ফল যাচাই করা হয়। ডিগ্রি মানে একজন প্রার্থী একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানকাঠামোর মধ্য দিয়ে গেছেন এবং শৃঙ্খলা মেনে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন, এই বার্তা। তাই এটিকে অবহেলার সুযোগ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ভিত্তি তৈরি করে। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী চিন্তা ও শেখার অভ্যাস সেখান থেকেই আসে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সেই জ্ঞানকে ফলে রূপ দিতে লাগে বাস্তব দক্ষতা। একই ডিগ্রিধারী দুজনের মধ্যে যিনি ভালোভাবে যোগাযোগ করতে পারেন, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তিনি সাধারণত বেশি মূল্য তৈরি করতে সক্ষম হন।

নিয়োগকর্তারা আসলে কী খোঁজেন

নিয়োগের সময় একজন ব্যবস্থাপক সাধারণত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজেন। এই ব্যক্তি কাজটি করতে পারবেন কি? নতুন পরিস্থিতিতে নিজে শিখে নিতে পারবেন কি? টিমের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবেন কি? এসব উত্তর সনদে লেখা থাকে না। সেগুলো ফুটে ওঠে প্রার্থীর প্রকল্প, ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগের ভঙ্গি আর সমস্যা সমাধানের চিন্তায়। তাই আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠান সিভি দেখার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা, কেস স্টাডি, ব্যবহারিক কাজ বা গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থীকে যাচাই করে। সেখানে যিনি হাতে-কলমে কাজ দেখাতে পারেন, তিনিই এগিয়ে থাকেন।

জি এম ফরিদ হোসেন।
জি এম ফরিদ হোসেন।

যে দক্ষতাগুলো আপনাকে এগিয়ে রাখবে

যোগাযোগ: স্পষ্ট ও গুছিয়ে কথা বলা এবং ই-মেইল বা প্রতিবেদন লেখার সক্ষমতা। কথা বলা, লেখা, উপস্থাপন এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা সবই ক্যারিয়ারের দক্ষতা। একজন কর্মী যত ভালো কাজই করুন, তা স্পষ্টভাবে বোঝাতে না পারলে তাঁর অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না।

ডিজিটাল দক্ষতা: এআই, ডেটা অ্যানালিটিকস, ক্লাউড, সিআরএম, গুগল শিট ও স্লাইড, ক্যানভাসহ নানা ডিজিটাল টুল এখন অনেক পেশার অংশ। সবাইকে প্রোগ্রামার হতে হবে না; তবে কাজকে দ্রুত, নির্ভুল ও কার্যকর করতে প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হবে। এক্সেল, প্রেজেন্টেশন তৈরি ও ডেটা বোঝা এখন প্রায় সব পেশায় দরকার।

সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণ: কর্মক্ষেত্রে সমস্যা থাকবেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যা চিহ্নিত করে কারণ খুঁজে বের করা, বিকল্প তৈরি করা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান বাস্তবায়ন করা। এই দক্ষতা একজন সাধারণ কর্মীকে মূল্যবান পেশাজীবীতে পরিণত করে।

দলগত কাজ ও নেতৃত্ব: অন্যের সঙ্গে মিলে কাজ করা, দায়িত্ব নেওয়া ও সময় ব্যবস্থাপনা এর অংশ। নেতৃত্ব মানে শুধু টিমের প্রধান হওয়া নয়। অন্যকে সহযোগিতা করা, মতভেদ সামলানো এবং অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে মানুষকে যুক্ত করাও নেতৃত্ব।

শেখার আগ্রহ: প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে, আজকের একটি দক্ষতা আগামী পাঁচ বছরে পুরোনো হয়ে যেতে পারে। তাই নতুন কিছু দ্রুত শেখা এবং প্রয়োজনমতো নিজেকে বদলে নেওয়া ক্যারিয়ারে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত।

ইংরেজি ভাষা: বিশেষ করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক কাজের ক্ষেত্রে এটি বড় সুবিধা দেয়।

পড়ার সময় যা করা যায়

দক্ষতা রাতারাতি তৈরি হয় না। তাই স্নাতকের শেষ বর্ষ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শুরু থেকে প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এক ইন্টার্ন মেলায় বলেছিলেন, অভিজ্ঞতাহীন সদ্য স্নাতকের জন্য প্রথম চাকরি পাওয়া কঠিন। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান পেইড ইন্টার্নশিপ দিচ্ছে, যেখানে কাজ করলে অভিজ্ঞতা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী চাকরির সুযোগও তৈরি হয়।

কয়েকটি বাস্তব পরামর্শ

ইন্টার্নশিপ ও স্বেচ্ছাসেবা: ছোট পরিসরে হলেও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা সিভিকে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

অনলাইন কোর্স ও প্রশিক্ষণ: পছন্দের ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট কোর্স করুন। তবে শুধু সনদ জমালে হবে না, যা শিখলেন, তা দিয়ে একটি ছোট প্রকল্প বানান।

ক্লাব ও সংগঠনে সক্রিয়তা: বিতর্ক, ক্যারিয়ার ক্লাব বা অন্য সংগঠনে যুক্ত হলে নেতৃত্ব ও দলগত কাজের হাতেখড়ি হয়।

পোর্টফোলিও তৈরি: লেখা, নকশা, কোড বা গবেষণা যা-ই করুন, এক জায়গায় সাজিয়ে রাখুন, যাতে নিয়োগকর্তাকে দেখাতে পারেন।

পেশাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ: সিনিয়র ও শিক্ষকদের কাছ থেকে পরামর্শ নিন। অনেক সময় সঠিক দিকনির্দেশনা বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

দক্ষতাই ভরসা

প্রথম চাকরি পাওয়াটাই শেষ নয়। পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি কিংবা ভালো প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ সবই নির্ভর করে কাজের মান ও নতুন দক্ষতা অর্জনের ওপর। যিনি নিয়মিত নিজেকে হালনাগাদ করেন এবং প্রযুক্তি ও বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলান, তিনি অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত