প্রশ্ন: ভ্রমণকালে বা চলন্ত যানবাহনে (লঞ্চ, ট্রেন, বিমান ও বাস) নামাজ আদায়ের সঠিক নিয়ম ও বিধান কী?
উত্তর: দৈনন্দিন প্রয়োজনে আমাদের বিভিন্ন সময় বাস, ট্রেন, লঞ্চ, জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে হয়। সফরের সময় নামাজের ওয়াক্ত হলে চলন্ত যানবাহনে কীভাবে নামাজ আদায় করতে হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট শরিয়তের বিধান জানা জরুরি।
লঞ্চ বা নৌকায় নামাজ আদায়ের পদ্ধতি
- স্থির বা বাঁধা লঞ্চ/নৌকা: লঞ্চ বা নৌকা যদি ঘাটে এমনভাবে বাঁধা থাকে যে বাতাসে নড়ে না, বরং স্থির থাকে, তাহলে তাতে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে কিবলামুখী হয়ে রুকু-সিজদাসহ নামাজ আদায় করতে হবে। আর যদি প্রচণ্ড বাতাসে অস্থির থাকে এবং নেমে আসার সুযোগ থাকে, তবে নেমে নামাজ আদায় করা উত্তম।
- চলন্ত লঞ্চ/নৌকা: নেমে আসা সম্ভব না হলে বা যানটি চলন্ত থাকলে, দাঁড়িয়ে কেবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করা আবশ্যক। লঞ্চ ঘূর্ণনের কারণে কিবলা পরিবর্তন হলে নামাজিকেও ঘুরতে থাকা অবস্থায় কিবলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে হবে।
- অসুস্থতা বা মাথা ঘোরা: যদি দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর হয় বা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে বসে স্বাভাবিক রুকু-সিজদা করে নামাজ আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
বিমান ও ট্রেনে নামাজ আদায়ের পদ্ধতি
বিমান ও ট্রেনে সাধারণত স্থান প্রশস্ত থাকে, তাই নামাজের যাবতীয় শর্ত (দাঁড়ানো, কিবলামুখী হওয়া ও পূর্ণ রুকু-সিজদা করা) পূরণ করে নামাজ আদায় করা সম্ভব।
- দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নিয়ম: শরীর দুললে বা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে কোনো কিছু ধরে বা হেলান দিয়ে দাঁড়ানো জায়েজ।
- অতিরিক্ত ভিড় বা প্রতিকূলতা: যদি চরম ভিড়ের কারণে দাঁড়ানো বা রুকু-সিজদা করা মোটেও সম্ভব না হয় কিংবা কিবলা নির্ধারণ করা না যায়, তবে যেভাবে সম্ভব সেভাবে সিটে বসে হলেও ইশারায় নামাজ আদায় করে নিতে হবে এবং পরে গন্তব্যে পৌঁছে তা কাজা করে নিতে হবে।
বাসে নামাজ আদায়ের পদ্ধতি
চলন্ত বাসে নামাজের সব শর্ত পালন করা কিছুটা কঠিন। তাই বাসে নামাজের ক্ষেত্রে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
- প্রথম চেষ্টা (বাস থামানো): বাসের ড্রাইভার ও সুপারভাইজারকে বলে বাস থামিয়ে রাস্তার পাশের কোনো মসজিদে স্বাভাবিকভাবে নামাজ আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে ওয়াক্ত শেষ না হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে গন্তব্যে গিয়ে আদায় করা যাবে।
- সিটে বসে নামাজের বিধান: বাস যদি না থামে এবং কেউ যদি সিট খালি করে হাঁটু গেড়ে বসে স্বাভাবিক রুকু ও সিটের ওপর সিজদা আদায় করতে পারে এবং কিবলা ঠিক রাখতে পারে, তবে অনেক আলেমের মতে সেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে। অনেকে নিজের আসনে বসে সামনের সিটের পেছনে কপাল ঠেকিয়ে সিজদা করেন; সর্বসম্মত মতে এভাবে নামাজ হয় না, তা পুনরায় আদায় করতে হবে।
যদি কোনো অবস্থাতেই নামাজ আদায়ের ফরজের শর্তগুলো পূরণ করা সম্ভব না হয়, তবু সময় পার না করে যেভাবে সম্ভব (সিটে বসে ইশারায় হলেও) নামাজ আদায় করে নেওয়া উচিত, যাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘হুরমাতুল ওয়াক্ত’ বলা হয়। এতে অন্তত ওয়াক্ত ছেড়ে দেওয়ার কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচা যাবে, তবে পরে সুযোগমতো এই নামাজ কাজা আদায় করে নিতে হবে।
সূত্র: আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৮৮; রদ্দুল মুহতার ২/১০২, ইলাউস সুনান ৭/২১২; জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩/৬২, মাআরিফুস সুনান ৩/৩৯৪-৯৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৮,১৪৪)
উত্তর দিয়েছেন: মুফতি দিদার হুসাইন, লেখক ও শরিয়াহ কনসালট্যান্ট










