৫ দিনের মাথায় চাকরি হারালেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি, নেপথ্যে কী

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণের সপ্তাহও পেরোয়নি। এর আগেই চাকরি ছাড়লেন কেটি জাকারাইয়া। তীব্র সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
কেটির দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার প্রথম সংবাদ ব্রিফিংয়ে তাঁর অস্বস্তিকর উপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে প্রথম প্রেস ব্রিফিংয়ের পর থেকেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন জাকারাইয়া। ব্রিফিংটি ১৫ মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়েছিল। সেখানে সাংবাদিকদের মাত্র তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
এর পরের কয়েক দিন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেই ব্যস্ত ছিলেন জাকারাইয়া। তাঁর যোগ্যতা এবং দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাঁকে।
শুক্রবার জাকারাইয়ার দায়িত্ব ছাড়ার খবর প্রকাশের কয়েক মুহূর্ত আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, জাকারাইয়াকে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি যদি না চান, তাহলে এটা করতে হবে না। সত্যি বলতে, আমি আপনার জায়গায় থাকলে বিষয়টি নিয়ে আবার ভাবতাম।’
শুক্রবার দুপুরের দিকে মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জাকারাইয়ার দায়িত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, “কেটি, এটা কি আপনার জন্য? কারণ, সত্যি বলতে, আপনার এই কাজ করার প্রয়োজন নেই। আপনাকে এভাবে এত খারাপ আচরণের শিকার হতে হবে না।
সংবাদমাধ্যম জাকারাইয়ার সঙ্গে ‘বেশ খারাপ’ আচরণ করেছে বলেও মনে করেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর বিবিসি তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই হোয়াইট হাউসে জাকারাইয়ার আকস্মিক বিদায়কে রিপাবলিকান প্রশাসনের ব্যর্থতার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরছেন ডেমোক্র্যাটরা। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে, মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা হাকিম জেফরিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির বিদায় ঘটেছে। মাগা উগ্রপন্থীরা ক্রমাগত ভেঙে পড়ছে।’
গত মঙ্গলবার এ পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। সেদিন প্রথম প্রেস ব্রিফিংয়ে তাঁকে দৃশ্যত নার্ভাস দেখাচ্ছিল। ১৪ মিনিটের ওই ব্রিফিংয়ে তিনি নোটবুক থেকে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান, অল্প কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং একপর্যায়ে নিজের স্বামীকে প্রেসিডেন্ট বলে উল্লেখ করেন।
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক জাকারাইয়ার কাছে জানতে চান, তিনি কোথায় আইনজীবীদের বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ট্রাম্পসহ আরও কয়েকজন তাঁকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ থেকে স্নাতকও হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আইন পেশায় কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ পেতে হয়, যার জন্য কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জাকারাইয়া বলেন, ‘আমি যখন চীনে ছিলাম।’
এরপর সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর যোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান ও প্রশ্ন তোলার পর বৃহস্পতিবার জাকারাইয়া স্বীকার করেন, তিনি বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। তবে এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নিয়েই চীনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত আইন নিয়ে কাজ করেছেন।
সপ্তাহজুড়ে তাঁর আইনগত যোগ্যতা নিয়ে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার রক্ষণশীল ধারার সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে বিশেষভাবে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি।
জাকারাইয়া বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার কথা জানালে হ্যানিটি তাঁকে বলেন, ‘আপনি সরাসরি কেন বলেননি, “আমি কখনো আইন পেশায় কাজ করিনি”?’
সাক্ষাৎকারে জাকারাইয়া আরও জানান, কী দ্রুততার সঙ্গে তাঁকে প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব নিতে হয়েছে। প্রথম ব্রিফিংয়ের এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এ কথা শুনে হ্যানিটি প্রশ্ন করেন, ‘আমি কি ঠিক বুঝছি যে আপনি মনে করেন, কর্মীদের আপনার প্রস্তুতির জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করা উচিত ছিল?’
শুক্রবার ট্রাম্পের প্রায়ই দেখা অনুষ্ঠান ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এ হাজির হলেও একই ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েন জাকারাইয়া।
তিনি বলেন, নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় না দেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পকে জানাননি, কারণ ‘এ ধরনের প্রশ্ন করা হয়নি’। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে আইনি দায়িত্বের জন্য নয়, বরং যোগাযোগবিষয়ক দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপক লরেন্স জোনস তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার কি মনে হয়, প্রেসিডেন্ট এখনো আপনার ওপর আস্থা রাখেন?’ জাকারাইয়া সরাসরি উত্তর দেওয়া এড়িয়ে যান। তবে শেষে বলেন, ‘আমার আশা, আশপাশের সবার আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারব।’
ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রেস টিমে জাকারাইয়ার বিদায়ই সবচেয়ে দ্রুত দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক অ্যান্থনি স্কারামুচ্চি মাত্র ১০ দিন দায়িত্ব পালনের পর পদ ছেড়েছিলেন। জাকারাইয়ার পদত্যাগের পর শুক্রবার এক্সে স্কারামুচ্চি লিখেছেন, ‘রেকর্ড ভাঙার জন্যই তৈরি হয়। তবে অন্যের কষ্টে আমি আনন্দ পাই না।’










