Ajker Patrika

বাংলাদেশি সন্দেহে স্বামী আটক, কলকাতা হাইকোর্টে স্ত্রী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বাংলাদেশি সন্দেহে স্বামী আটক, কলকাতা হাইকোর্টে স্ত্রী
কলকাতা হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মুর্শিদাবাদের রানি নগর থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে গত ৮ আগস্ট গভীর রাতে শহীদুল শেখকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। সেই থেকে তিন সন্তান ও স্ত্রী দেজিনা বিবি স্বামীকে খুঁজে ফিরছেন। অবশেষে স্বামী বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছে অভিযোগ করে দ্বারস্থ হলেন কলকাতা হাইকোর্টের।

শহীদুল শেখ কৃষিকাজ করতেন। মুর্শিদাবাদের দুবাপাড়া গ্রামে পরিবার নিয়ে বাস করতেন তিনি। শহীদুলের বাবাও এই গ্রামেই থাকতেন বলে দাবি করেন স্বজনেরা।

পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তিনি ফোরেনার্স রিজিনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (এফআরও) হেফাজতে থাকলেও পুলিশ কোনো নথিপত্র বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হস্তান্তরিত করেনি।

সাহিদুলের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বাপি মণ্ডল দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আটকের পর এখন পর্যন্ত পুলিশ আমাদের কোনো নথি দেয়নি। পুলিশ আমাদের কিছুই জানায়নি কিংবা গ্রেপ্তারি স্মারক বা জব্দ তালিকার মতো কোনো নথিও দেয়নি।’

৩৪ বছর বয়সী দেজিনা বিবি কলকাতা হাইকোর্টে করা আবেদনে অভিযোগ করেছেন, তাঁর স্বামীকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের অভিযোগ, তিনি বাংলাদেশি নাগরিক।

দেজিনা বিবি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমার স্বামী হঠাৎ কীভাবে বাংলাদেশি হয়ে গেলেন? এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) প্রক্রিয়ার সময় আমরা সমস্ত নথি জমা দিয়েছিলাম এবং তা অনুমোদিতও হয়েছিল। গত বিধানসভা নির্বাচনেও আমরা ভোট দিয়েছি। তাহলে কি আমরা এই দেশের নাগরিক নই? নির্বাচন শেষ হতে না হতেই তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো!’

পুলিশ যেদিন তাঁদের বাড়িতে এসেছিল, সেই রাতের কথা এখনো মনে আছে দেজিনার। তিনি বলেন, ‘রাত প্রায় ১২টার দিকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। দেখি পুলিশ এসেছে। তারা আমাদের নথিপত্র দেখতে চায়। সব দেখে আমার স্বামীকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে। পরদিন সকালে আমি পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে থানায় যাই এবং তাঁর বিষয়ে জানতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ আমাদের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি। তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে বা তাঁর কী হয়েছে, সেটিও জানায়নি। এমনকি তাঁকে কোনো আদালতেও হাজির করা হয়নি। আমি সেখানে তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। এরপর থেকে প্রতিদিনই সেখানে যাচ্ছি।’

দেজিনা বিবি বলেন, ‘প্যান কার্ড, আধার কার্ড থেকে শুরু করে বিয়ের সনদ সব নথি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল, পঞ্চায়েতের পোর্টালেও তাঁর নাম আছে। তাঁর নামে সম্পত্তিও নিবন্ধিত রয়েছে। যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশি, তা সত্য নয়। তিনি ভারতীয়। আর এখন আমাদেরই সেটা প্রমাণ করতে হচ্ছে।’

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তিন সন্তানসহ দেজিনা বিবি। তিনি জানান, তিনি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মাসিক সহায়তা পান। তাঁদের বাড়ি নির্মাণের জন্যও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

দেজিনা আরও বলেন, ‘আমার সন্তানদের মধ্যে বড় মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট দুই ছেলে স্কুলে যেতে চায় না, ঠিকমতো খেতেও চায় না। তারা শুধু বাবার জন্য কাঁদে। তিনিই একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। আমি আমার স্বামীকে ফিরে পেতে চাই।’

সম্প্রতি বন্যায় তাঁদের মালিকানাধীন জমিগুলো পানিতে ভেসে গেছে। ওই জমিতেই সাহিদুল কৃষিকাজ করতেন। দেজিনা বলেন, ‘তিনি কৃষক ছিলেন। মাঝেমধ্যে অন্য কাজও করতেন। এখন পরিবারের কোনো উপার্জনকারী নেই। আমার সন্তানরাও কাজ করার মতো বয়সে পৌঁছায়নি।’

মামলাটি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চে উঠলে, তিনি রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেন আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শহীদুলের আটকের ভিত্তি উল্লেখ করে একটি হলফনামা পেশ করতে। এ ছাড়া শহীদুলকে আটকের বা গ্রেপ্তারের স্মারক তাঁর আইনজীবীর কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন।

একই সঙ্গে এফআরওর দায়িত্বে থাকা মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারকে ১০ দিনের মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে রাজ্য এ পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানাতে হবে।

৮ অক্টোবর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে বলে জানা গেছে।

সাহিদুলের আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আটক ব্যক্তি একজন ভারতীয় নাগরিক। তাঁর কাছে ভোটার কার্ড, আধার, প্যান কার্ড, দলিল, রেশন কার্ডসহ অন্যান্য বৈধ নথি রয়েছে। তাঁর বড় মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। কোনো ধরনের আইনি কার্যক্রম বা তদন্ত ছাড়াই ৮ আগস্ট ২০২৬ থেকে তাঁকে সন্দেহের ভিত্তিতে আটক করে রাখা হয়েছে। এটি মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’

এ দিকে রাজ্যের আইনজীবীর দাবি, শহীদুল বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে এখানে বসতি স্থাপন করেছেন।

রাজ্যের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়, শহীদুল অনেক দিন আগে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন বলে স্বীকার করেছেন। এরপর তিনি মৃত এক স্থানীয় বাসিন্দার ছেলে হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন এবং জাল পরিচয়পত্র অবৈধভাবে অর্জন করেন।

তবে আদালত আদেশে বলেছেন, ‘রাজ্যের পক্ষের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট নয় যে ওই স্বীকারোক্তি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের সামনে দেওয়া হয়েছিল, নাকি পুলিশ সুপার-কাম-ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (এফআরও) সামনে। তবে আদালতকে জানানো হয়েছে যে পুলিশের একজন উপপরিদর্শক (এসআই) আবেদনকারীর স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত