Ajker Patrika

বাসচালকের আসন থেকে মসনদে, কে এই নিকোলাস মাদুরো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি: এএফপি
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি: এএফপি

আজ ৩ জানুয়ারি, ২০২৬। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম নিকোলাস মাদুরো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, এক বিশেষ সামরিক অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে ভেনেজুয়েলার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজও মাদুরোর আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি জানেন না, মাদুরো এখন কোথায়।

সাধারণ এক বাসচালক থেকে একটি দেশের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার এই যাত্রাপথ ছিল যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই নাটকীয়।

১৯৬২ সালে কারাকাসে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন মাদুরো। তাঁর বাবা ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাদুরো উচ্চশিক্ষার বদলে রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে কিউবায় পাড়ি জমান।

পরবর্তী সময়ে কারাকাসে ফিরে তিনি পাবলিক বাসের চালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি পরিবহনশ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়ে নিজের রাজনৈতিক জীবনের ভিত গড়েন।

১৯৯২ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর কারাগারে থাকা হুগো শাভেজের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার ছিলেন মাদুরো। শাভেজ মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তাঁর ডান হাতে পরিণত হন এবং শাভেজের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ‘শাভিজমো’র একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

হুগো শাভেজের দীর্ঘ শাসনামলে মাদুরো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬-১৩ পর্যন্ত তিনি ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন আঞ্চলিক জোট (যেমন এএলবিএ ও সিইএলএসি) গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন।

২০১২ সালে শাভেজ অসুস্থ হয়ে পড়লে মাদুরোকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।

২০১৩ সালের বিশেষ নির্বাচনে খুব সামান্য ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি ভেনেজুয়েলার পূর্ণ ক্ষমতা লাভ করেন। তবে ওই নির্বাচন থেকেই তাঁর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে বিরোধী দল ও পশ্চিমা বিশ্ব।

সর্বশেষ মাদুরোর গত ১২ বছরের শাসনকাল ছিল বিতর্ক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ঠাসা। তাঁর আমলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি প্রায় ৭২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ও দারিদ্র্যের কারণে দেশটির লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে তাঁর সরকারকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর বদলে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করার পর মাদুরো আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েন।

২০২১ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ডিইএ) মাদুরোকে ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে একটি ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

আজকের এই দিনে (৩ জানুয়ারি) মাদুরোর ভাগ্য চরম অনিশ্চয়তায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন বিশেষ বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ কারাকাসের বাসভবন থেকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। কারাকাস এখন বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ টেলিভিশনে মাদুরোর ‘জীবিত থাকার প্রমাণ’ চেয়ে আকুতি জানাচ্ছেন।

যদি ট্রাম্পের দাবি সত্য হয়, তবে এটি হবে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পালাবদল। বাসচালকের আসন থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মাদুরো কি তবে শেষ পর্যন্ত বন্দিশালায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানছেন?—এ প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত