Ajker Patrika

অন্তঃসত্ত্বাদের ‘ভুলে যাওয়া’ সমস্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করলেন বিজ্ঞানীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ২৩
অন্তঃসত্ত্বাদের ‘ভুলে যাওয়া’ সমস্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করলেন বিজ্ঞানীরা
মমোনেশিয়া সমস্যার সমাধান খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: পেক্সেলস

ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা তরী। নিজের কাজগুলো নিজেই করতে পছন্দ করেন। তবে ইদানীং কিছু বিষয় নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়ছেন তিনি। রান্নাঘরে গিয়ে কেন গিয়েছিলেন, মনে পড়ছে না। কাউকে কল দিতে ফোন হাতে নিয়েছেন, কিন্তু মনে পড়ছে না কাকে কল দেবেন। কিছু খুঁজতে পাশের ঘরে গেছেন, সেখানে গিয়ে ভুলে গেছেন, কী খুঁজতে এসেছেন।

এ ধরনের ভুলে যাওয়া ভাবনায় ফেলেছে তরীকে। আসলেই কি স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়ছেন তিনি?

বিজ্ঞান বলছে, অন্তঃসত্ত্বাদের এ ধরনের ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। একে ‘মমোনেশিয়া’, ‘মমি ব্রেইন’, ‘প্রেগন্যান্সি ব্রেইন’ বা ‘বেবি ব্রেইন’ বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। তবে এর কারণ খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।

সম্প্রতি ‘সায়েন্স বুলেটিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন, এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনে জৈবিক কারণ রয়েছে। এবার এর সম্ভাব্য একটি ব্যাখ্যাও পেয়েছেন তাঁরা। গবেষকেরা মস্তিষ্কের এমন একটি নির্দিষ্ট স্নায়ুপথ শনাক্ত করেছেন, যা গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকার কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গবেষণায় ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গর্ভাবস্থায় যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দেখা যায়, ইঁদুরের শরীরেও পরীক্ষামূলকভাবে তেমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এতে প্রাণীগুলোর সাময়িক স্মৃতিশক্তি কমে যায়। তবে তাদের মেজাজে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

গবেষকেরা দেখেছেন, এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে একটি স্নায়ুপথে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব। এর একটি হলো হাইপোথ্যালামাস। এটি মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং বিভিন্ন তথ্য সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যটি হিপোক্যাম্পাস, যা স্মৃতি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গবেষণায় দেখা যায়, ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেড়ে গেলে হাইপোথ্যালামাসের কিছু নিউরনের কার্যক্রম বেড়ে যায়। এর ফলে হিপোক্যাম্পাসের কার্যক্রম কমে যায় এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়।

গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের এন্ডোক্রাইনোলজি ও মলিকিউলার বায়োলজির অধ্যাপক ডা. ঝেং সান। তিনি জানান, মমোনেশিয়া গর্ভাবস্থার শেষ দিকে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সন্তান জন্মের পরও কিছু সময় এটি থাকতে পারে। তবে সাধারণত সন্তান জন্মের পর ধীরে ধীরে তা কমে যায়।

সান আরও জানান, এতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের স্মৃতিই প্রভাবিত হতে পারে। যেমন কোনো নাম বা শব্দ মনে করতে সমস্যা হওয়া, পরিচিত কোনো তথ্য মনে করতে কষ্ট হওয়া কিংবা কোনো জায়গা, মানুষ বা সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য মনে করতে অসুবিধা হতে পারে।

তবে এটি গুরুতর বা চিকিৎসাগতভাবে অক্ষম করে দেওয়ার মতো কোনো সমস্যা নয় বলে জানান সান। তবে দৈনন্দিন কাজকর্ম ও আত্মবিশ্বাসে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সানের ভাষায়, এর সাধারণ উদাহরণ হলো কোনো ঘরে গিয়ে কেন গিয়েছেন তা ভুলে যাওয়া, কোনো জিনিস কোথায় রেখেছেন তা মনে না থাকা, কথোপকথনের মাঝখানে কী বলছিলেন তা হারিয়ে ফেলা কিংবা কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হওয়া।

সান আরও বলেন, এ ধরনের পরিবর্তন ব্যাপকভাবে দেখা যায়। প্রায় ৮০ শতাংশ গর্ভবতী নারী এমন পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। তবে এই পরিসংখ্যান মূলত তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, বস্তুনিষ্ঠ পরীক্ষার ফলের ওপর নয়।

গবেষকেরা বলছেন, এ ধরনের পরিবর্তনের অর্থ এমন নয় যে গর্ভাবস্থায় একজন নারীর সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির পেনিংটন বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের ব্রেন গ্লাইসেমিক অ্যান্ড মেটাবলিজম কন্ট্রোল ল্যাবরেটরির পরিচালক এবং গবেষণাটির সহলেখক ডা. ইয়ানলিন হে বলেন, ‘গর্ভাবস্থা কাউকে কম বুদ্ধিমান করে তোলে না। এর প্রভাব বরং আরও সূক্ষ্ম এবং নির্দিষ্ট কিছু ধরনের চিন্তাশক্তি বা স্মৃতিনির্ভর কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে।’

ইস্ট্রোজেন এমন একটি হরমোন, যা নারীর গর্ভাবস্থা, মাসিক চক্র ও বয়ঃসন্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি শরীরে এমন বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটায়, যা ভ্রূণকে ধারণ করা, তার বিকাশে সহায়তা করা এবং সন্তান জন্মদানের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থায় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিকে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

গবেষকেরা দেখেছেন, ‘ইস্ট্রোজেন রিসেপ্টর আলফা’ নামের একটি প্রোটিন হাইপোথ্যালামাসের কোষে ইস্ট্রোজেনের সংকেত পৌঁছে দেয়।

হাইপোথ্যালামাসে প্রচুর পরিমাণে গ্যাবার্জিক নিউরন রয়েছে। এসব নিউরন সাধারণত মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশে শান্ত বা নিয়ন্ত্রণকারী সংকেত পাঠায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকলে ইঁদুরের এসব নিউরনের বাধাদানকারী সংকেত অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হিপোক্যাম্পাসে।

গবেষকেরা ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে কোনো বস্তু এবং তার অবস্থান চিনতে পারার মতো পরীক্ষাও ছিল। উচ্চ মাত্রার ইস্ট্রোজেন পাওয়া ইঁদুরগুলোর স্মৃতিশক্তিতে অন্য ইঁদুরের তুলনায় দুর্বলতা দেখা যায়।

পরে গবেষকেরা পরীক্ষামূলকভাবে হাইপোথ্যালামাস থেকে হিপোক্যাম্পাসে যাওয়া ওই স্নায়ুপথের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তখন ইঁদুরগুলোর ইস্ট্রোজেনের কারণে তৈরি স্মৃতির সমস্যা আর দেখা যায়নি।

অন্যদিকে, একই স্নায়ুপথকে পরীক্ষামূলকভাবে সক্রিয় করা হলে ইঁদুরগুলোর স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এমনকি তাদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা না বাড়ালেও এমনটি দেখা যায়।

অধ্যাপক সান বলেন, ‘আমরা যখন জিনগতভাবে এসব হাইপোথ্যালামাস নিউরন থেকে ইস্ট্রোজেন রিসেপ্টর সরিয়ে দিয়েছি, তখন ইঁদুরের ইস্ট্রোজেন ও গর্ভাবস্থাজনিত স্মৃতির সমস্যাও দূর হয়ে গেছে।’

মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্নায়ুপথ একই ভূমিকা পালন করতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। তবে মানুষের ওপর এ ধরনের পরীক্ষা সরাসরি করা সম্ভব নয়। তবে ইঁদুরের পরীক্ষার পাশাপাশি গবেষকেরা ৭০ জন নারীর স্মৃতিশক্তিও মূল্যায়ন করেছেন। তাঁদের মধ্যে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের নারী যেমন ছিলেন, তেমনি গর্ভবতী নন এমন নারীও ছিলেন।

দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি ও কার্যকরী স্মৃতিশক্তি যাচাই করতে তাঁদের বিভিন্ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, গর্ভাবস্থার শেষ দিকে নারীদের স্মৃতিশক্তিতে কিছুটা দুর্বলতা দেখা দেয়। একই সময়ে তাঁদের রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রাও বেশি ছিল।

অধ্যাপক হে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকার সঙ্গে স্মৃতিসংক্রান্ত কয়েকটি পরীক্ষায় নেতিবাচক ফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্য সম্ভাব্য কারণগুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক দেখা গেছে। ইঁদুরের ক্ষেত্রে আমরা যে প্রক্রিয়া শনাক্ত করেছি, মানুষের ক্ষেত্রেও ফলাফল তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে গবেষকেরা সরাসরি ওই নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের কার্যক্রম পরিবর্তন বা পরিমাপ করেননি। ফলে মানুষের ওপর পাওয়া ফলাফল গবেষকদের ধারণাটিকে সমর্থন করলেও, ইঁদুরের পরীক্ষার মতো একই মাত্রার কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো প্রমাণ করে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত