Ajker Patrika

৪ লাখ গাছ কেটে বন উজাড়, ফিনল্যান্ডে তোপের মুখে গুগল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
৪ লাখ গাছ কেটে বন উজাড়, ফিনল্যান্ডে তোপের মুখে গুগল
তোপের মুখে কাজ বন্ধ করে নতুন করে বনায়ন শুরু করেছে গুগল। ছবি: এএফপি

ফিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা মুহোস-এর ঘন পাইন বনের ভেতরের ৩৩০ হেক্টর এলাকা জুড়ে এখন কেবলই কাদা ও মাটির ঢিবি। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল-এর প্রস্তাবিত এক বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য কয়েক মাস আগে এই বনের প্রায় আড়াই লাখ গাছ কেটে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেশী গ্রাম ওতানমাকি-তেও কাটা পড়েছে আরও প্রায় দেড় লাখ গাছ।

প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন না করেই আইন লঙ্ঘন করে এই বিশাল বনাঞ্চল ধ্বংস করার অভিযোগে দেশটির পরিবেশ তদারকি সংস্থা ‘এলভিভি’ চলতি মাসের শুরুর দিকে গুগলের নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিনল্যান্ডজুড়ে তীব্র গণঅসন্তোষ ও পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক এক ব্যাপক জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ইউরোপজুড়ে বহু নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জমি পাওয়ার সুবিধা এবং বিশেষ করে প্রাকৃতিকভাবে শীতল জলবায়ুর কারণে বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে ফিনল্যান্ড প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

গুগলের এই ১৩ বিলিয়ন ইউরোর এআই অবকাঠামো প্রকল্পটি উত্তর ইউরোপের কোনো দেশে এ যাবৎকালের বৃহত্তম বিনিয়োগ। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতেরি অর্পো এই বিনিয়োগকে দেশের জন্য একটি ‘শীর্ষ অগ্রাধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার প্রত্যাশা করেছিলেন।

তবে অবৈধভাবে বনাঞ্চল ধ্বংসের খবর সামনে আসার পর ফিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হওয়া, স্থানীয় বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া এবং আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টদের জন্য নিজস্ব সম্পদ উজাড় করা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন পরিবেশবাদীরা।

ফিনিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর নেচার কনজারভেশন (এসএলএল) বোর্ডের সভাপতি হান্না হালমিনপা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘প্রথমে আমি খবরটি বিশ্বাসই করতে পারিনি। ফিনল্যান্ডে কোনো প্রতিষ্ঠান আগে কখনো এমনটা করেছে বলে শুনিনি। আমাদের এখানকার আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্বাসের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, আর গুগল সেই সুযোগটাই নিয়েছে।’

পরিবেশবিদদের মতে, বন উজাড় করার ফলে এলাকার বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, মাটির একদম উপরিভাগ চেঁচে ফেলার কারণে খনন করা স্থান থেকে ঘোলা ও বাদামি পানি গড়িয়ে নদীর পানির সঙ্গে মিশছে। ওতানমাকির বাসিন্দাদের দাবি, বন কেটে ফেলার ফলে লোকালয়ে বন্য নেকড়ের আনাগোনা বেড়ে গেছে এবং স্থানীয় বিরল প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হয়েছে।

ইতিমধ্যেই ফিনল্যান্ডের ৯৩ হাজারেরও বেশি মানুষ ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য আরও কঠোর আইন প্রণয়ন এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবির পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন।

বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর গুগলের ফিনল্যান্ড প্রধান আনতি ইয়ারভিনেন গাছ কাটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁর দাবি, তৎকালীন আইনের ব্যাপারে তাঁদের যেমন ধারণা ছিল, সেই অনুযায়ীই কাজ করা হয়েছিল।

গুগলের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তারা এলভিভির নির্দেশ মেনে মুহোস ও ওতানমাকির প্রাথমিক কাজ স্থগিত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা বজায় রেখে প্রায় ১৩০ হেক্টর জমিতে নতুন করে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করছে।

তবে পরিবেশবিদদের দাবি, যে পরিমাণ বন ধ্বংস করা হয়েছে, তার তুলনায় গুগলের ক্ষতিপূরণমূলক পুনঃবনায়নের পরিকল্পনা অত্যন্ত অপ্রতুল।

২০২৭ সালের এপ্রিলে ফিনল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাজনীতি ও পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক করপোরেশনগুলোর এই অবাধ অর্থনৈতিক প্রাধান্য এবং পরিবেশ সুরক্ষার দ্বন্দ্বে গুগলের এই ঘটনাটি আসন্ন নির্বাচনে একটি অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত