Ajker Patrika

ডিমের দাম বাড়ে, লাভ যায় কার পকেটে

আবুল বাসার সাজ্জাদ, ঢাকা
ডিমের দাম বাড়ে, লাভ যায় কার পকেটে
চলতি অক্টোবরের শুরুতে সর্বোচ্চ দামে কিনতে হয়েছে ডিম। ছবি: আজকের পত্রিকা

এক সময় মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে স্বল্প আয়ের পরিবারের খাবারের তালিকায় নিয়মিত জায়গা পেত ডিম। কিন্তু সেই ডিমের দামও বাড়ছে। এতে বাড়তি চাপ পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যব্যয়ে।

এদিকে, দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সমন্বয় করতে পারছেন না বলে দাবি করছেন খামারিরা। তাঁদের অভিযোগ, ডিমের বাজারে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্ষুদ্র খামারিরা।

দেড় মাস ধরে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম। যা চলতি মাসের শুরুতে ক্রেতাদের কিনতে হয়েছে সর্বোচ্চ দামে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের শুরুতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ডিমের দাম বেড়েছিল সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ডজনপ্রতি ক্রেতাদের বাড়তি গুনতে হয়েছে ১৫ টাকারও বেশি।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর প্রতি ডজন ডিমের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১৬৫ টাকা। খুচরা বাজারে তা ১৭৫ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে। তবে বর্তমানে দাম কিছুটা কমে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬২ টাকায়।

দামের এই ওঠানামায় চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। চার সদস্যের একটি পরিবারে প্রত্যেকে প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলে মাসে প্রয়োজন হয় ১২০টি। ডজনপ্রতি ১৬২ টাকা হিসাবে পরিবারটির শুধু ডিম কিনতে ব্যয় হয় ১ হাজার ৬২০ টাকা। ডজন ১৫০ টাকা থাকলে একই পরিমাণ ডিম কিনতে খরচ হতো ১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ মাসে বাড়তি ব্যয় ১২০ টাকা। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই বাড়তি খরচও কম নয়।

রাজধানীর রামপুরা এলাকায় ফুচকা বিক্রি করেন আমির হোসেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার তাঁর। তিন সন্তানের জন্য প্রতিদিন তিনটি ডিম প্রয়োজন হলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত তা কিনতে পারছেন না।

আমির হোসেন বলেন, ‘আমরা বাবা-মা না খেলেও সন্তানদের খাওয়াতে হয়। কিন্তু এখন দাম বাড়ায় নিয়মিত ডিম খাওয়ানোর সুযোগ নেই। এক দিন বা দুই দিন পরপর খাওয়াতে হয়।’

ফুচকা বিক্রি করে মাসে ১৫ হাজার টাকার কিছু বেশি আয় করেন তিনি। তাঁর দুই সন্তান মাদ্রাসায় পড়ে, আরেকজনের বয়স দেড় বছর। বাসাভাড়া ও সংসারের খরচ মেটানোর পর হাতে টাকা থাকে না।

পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারী আমির বলেন, ‘অভাবের সংসারে সব সময় টানাপোড়েন লেগেই থাকে। এর মধ্যে কোনো কিছুর দাম বাড়লে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়।’

একই চিত্র রিকশাচালক আল আমিনের পরিবারেও। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীতে থাকেন তিনি। আগে সপ্তাহে অন্তত এক ডজন, কখনো দুই ডজন ডিম কিনতেন। এখন দামের কারণে সপ্তাহে দুই হালির মতো ডিম কিনতে পারছেন।

আল আমিন বলেন, ‘আগে ডিমসহ অন্য জিনিসের দামও কম ছিল। কিন্তু এই এক মাস ধরে ডিম কেনা কমিয়ে দিয়েছি। দামের কারণে পরিবারে ডিম খাওয়াও কমে গেছে।’

রাজধানীর রামপুরার সততা রাইস অ্যান্ড গ্রোসারিতে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছিল ১৬০ টাকায়। দোকানটির বিক্রেতা দ্বীন ইসলাম জানান, তিনি এক ডজন কিনেছেন ১৫০ টাকায়। তাঁর দাবি, এই দামে বিক্রি করে এক টাকাও লাভ হচ্ছে না। তবে দোকান পরিচালনা, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকৃত মুনাফা কত থাকছে, তা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট নয়।

এদিকে, রামপুরায় স্বপ্ন সুপারশপের বিভিন্ন আউটলেটে দেখা গেছে, প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা দরে, অর্থাৎ ডজন ১৫৬ টাকা।

দাম বাড়লেও লাভের নিশ্চয়তা নেই খামারির

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খামারি মো. ইকবাল প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ডিম উৎপাদন করেন। গত শুক্রবার তিনি প্রতিটি ডিম পাইকারিতে সাড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। সে হিসাবে ডজনপ্রতি বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা।

ইকবাল বলেন, ‘বাজারে ক্রেতাদের বেশি দামে কিনতে হলেও সেই লাভের ভাগ পুরোপুরি আমরা পাই না। আমাদের প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ ১১ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকায়।’

ময়মনসিংহের ভালুকার খামারি মো. সুমনের অভিযোগ, মুরগির বাচ্চা সংগ্রহ থেকে শুরু করে খাদ্য কেনা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি খামারিরা বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। বাচ্চা কিনতে গেলে কখনো সংকট দেখা দেয়। আবার কোনো কোনো কোম্পানি থেকে বাচ্চা কিনলে তাদের উৎপাদিত খাদ্যও কিনতে হয়। খাদ্যের দাম বেশি বা মান খারাপ হলেও বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না বলে দাবি তাঁর।

সুমন বলেন, খাদ্যের মান ভালো না হওয়ায় ডিম উৎপাদন কমছে। প্রতি বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা, যা গত দুই মাসেই বস্তাপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

পোলট্রি ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা, সয়াবিন খৈল ও রাইস পলিশ (চালের কুঁড়া)। এসব কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (এফআইএবি)।

বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, গত বছর ডিমের দাম কম থাকলেও পোলট্রি খাদ্য ও উৎপাদন খরচ কমেনি। বড় ব্যবসায়ীরা সাময়িক লোকসান দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন করে তোলেন। পরে বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হলে দাম বাড়ান—এমন অভিযোগ তাঁর।

সুমন হাওলাদারের দাবি, বড় কোম্পানিগুলোর প্রভাবে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি পরিচালিত হয়। সমিতি প্রতিদিন এসএমএসের মাধ্যমে ডিমের দাম ঘোষণা করে, যা বাজারে প্রভাব ফেলে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি পোলট্রি খাদ্য, মুরগির বাচ্চা ও ভ্যাকসিনের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন খরচের সঙ্গে ১০ শতাংশ মুনাফা যুক্ত করে খামার পর্যায়ে ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানান।

এদিকে, ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি না করার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ডিম ও পোলট্রি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

‘সিন্ডিকেটের দায়’

ডিমের বাজারে অস্থিরতার পেছনে কয়েকটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তাঁর দাবি, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিমের দাম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছে। আগের দিন এসএমএসের মাধ্যমে দাম ঠিক করা হয়, যা পরদিন বাজারে কার্যকর হয় বলে অভিযোগ তাঁর।

সফিকুজ্জামানের ভাষ্য, কাজী ফার্মস, নারিশসহ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মুরগির বাচ্চা, পোলট্রি খাদ্য ও ভ্যাকসিনের বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। এসব উপকরণের জন্য বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র খামারিরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

তিনি কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের কিছু ব্যবস্থাকে দাদন প্রথার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এতে ক্ষুদ্র খামারিরা বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

বাজার স্থিতিশীল রাখতে তদারকি জোরদার, মজুত ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ক্যাব সভাপতি।

বাজারে কারসাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান জানতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত