Ajker Patrika

সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্সের হিসাবে পদে পদে নয়ছয়

আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা
সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্সের হিসাবে পদে পদে নয়ছয়

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির হোসেনের মালিকানাধীন সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্সের আর্থিক হিসাবে নয়ছয় হয়েছে পদে পদে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানি পরিচালনায় মানা হয়নি কোনো নিয়মনীতি। এমনকি অনৈতিকভাবে অনুমোদন হতো বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনও।

সেখানে গোঁজামিলের সুবিধার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো সম্পদ বেশি এবং কখনো কম দেখানো হতো। এতেই শেষ নয়, কোম্পানির বিনিয়োগ ও শেয়ার ধারণ, সিকিউরিটিজ ও শ্রম আইনের প্রতিপালনেও মিলেছে নানা অসংগতি। আর বড় রকমের ঘাটতি ধরা পড়েছে অবণ্টিত লভ্যাংশের হিসাবে। ২০২৩ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এভাবেই সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্সের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অনুমোদন নেওয়ার প্রমাণ বা নথি দিতে পারেনি সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স। অর্থাৎ, নিয়ম মেনে বিনিয়োগকারীদের অনুমোদন নিতে এজিএম করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবসিডিয়ারি কোম্পানি সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট থেকে ২০১৬-১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার পেয়েছে সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি। ওই বোনাস শেয়ারকে বিনিয়োগ ও আয় হিসাবে দেখায় বিমা কোম্পানিটি। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া আর্থিক হিসাবে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার সম্পদ ও ইক্যুইটি বেশি দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে বিমা কোম্পানিটির সমন্বিত হিসাবে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে নন-কন্ট্রোলিং ইন্টারেস্ট (সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে যতটুকুর মালিকানা কোম্পানির হাতে নেই) ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কম দেখানোর বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ম্যানেজমেন্ট।

বিএসইসির নির্দেশনারও ব্যত্যয় করেছে সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স। এতে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন হয়েছে। বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, অবণ্টিত লভ্যাংশ পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখতে হয়। কিন্তু এই পৃথক হিসাবে কোম্পানিটির অবণ্টিত লভ্যাংশের ৫০ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে। ২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী, কোম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করতে হয়। তবে সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ সেটি করেনি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কোম্পানির অনিয়ম খুঁজে পেয়েছেন নিরীক্ষক। আইডিআরের সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ বা স্ট্যাচুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) অনুযায়ী, সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স সম্পদের ২০ শতাংশ সাবসিডিয়ারিতে বিনিয়োগ করতে পারবে। কিন্তু বিমা কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগ করেছে ২৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।

বিমা কোম্পানি আইন, ২০১০ অনুযায়ী, উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে শেয়ার ধারণ করতে হবে ৬০ শতাংশ। কিন্তু সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্সের শেয়ার ধারণের পরিমাণ মাত্র ৩৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

নিরীক্ষকের তথ্যমতে, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ দুটি এফডিআর ভেঙে ১০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে বলে জানিয়েছে, তবে এ বিষয়ে পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট ছাড়া পর্যাপ্ত নথি দিতে পারেনি। এ ছাড়া ৬ কোটি ১৭ লাখ টাকার রিয়েলাইজড লসসহ ৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকার পোর্টফোলিও যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। কোম্পানির সাধারণ রিজার্ভের ৪৫ লাখ টাকা রিটেইন্ড আর্নিংসে (পুঞ্জীভূত মুনাফা) স্থানান্তরের বিষয়েও কোম্পানির কর্তৃপক্ষের নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রমাণ দিতে পারেনি।

শেয়ার ধারণের বিষয়ে কোম্পানি সচিব আব্দুর রউফ গোমস্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আইডিআরএ থেকে পরিপত্র জারি করার কথা, সেটা এখনো করেনি। ফলে বাধ্যবাধকতার মধ্যে আসেনি, তাই আমাদের ৪০ শতাংশ আছে।’ ডব্লিউপিপিএফের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো বিমা কোম্পানিই এটি পরিপালন করে না।

কোম্পানির এজিএমের বিষয়ে সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্সের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এ বি এম হাসাঙ্গীর জানান, ২০২২ সালের স্পেশাল এজিএম হয়েছে।

সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বোনাস ব্যালেন্স শিটে রিইনভেস্টমেন্ট হিসাবে দেখিয়েছি, যা আগের অডিটররা মেনেও নিয়েছেন। 
কোম্পানির নন-কন্ট্রোলিং ইন্টারেস্টের বিষয়ে এ বি এম হাসাঙ্গীর বলেন, সব দায় মোকাবিলার পরই তো শেয়ারহোল্ডার টাকা পাবেন। 

বিষয়:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত