রাজধানী ঢাকায় গত সাড়ে ছয় বছরে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৮ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩৪ জন (৭৪ দশমিক ৭১ শতাংশ), নারী ২১৯ জন (১৫ দশমিক ৮২ শতাংশ) এবং শিশু ১৩১টি (৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ)।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনার ওপর একটি প্রতিবেদন গতকাল শনিবার প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের বছরওয়ারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ছিল ১২৪টি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪০৭টিতে দাঁড়ায়। সড়কে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয় ২০২৩ সালে, ওই বছর ২৯৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয় ২৮৯ জন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়লেও প্রাণহানি কিছুটা কমেছে। তবে আহতের সংখ্যা বেড়ে ২০২৫ সালে ৫১১ জনে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই ২৩৩টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত ও ৩৫৬ জন আহত হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মনে করছে, রাজধানীর সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়ক বর্তমানে রাজধানীর দুর্ঘটনাপ্রবণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পথচারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মোট নিহতের মধ্যে ৫৯২ জন (৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ) পথচারী, ৫৩৬ জন (৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ) মোটরসাইকেল আরোহী এবং বাস, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রী ২৫৬ জন (১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ)।
রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্যাংকলরি ও ময়লাবাহী ট্রাকের হার সবচেয়ে বেশি, ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ, বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, অটোরিকশা-সিএনজিচালিত অটোরিকশা-লেগুনা ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-জিপ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। এ সময়ে নিহত হয়েছে ৫১৯ জন (৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ)। সকালে ২৫৮ জন (১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ), দুপুরে ১৯৫ জন (১৪ দশমিক ৮ শতাংশ), বিকেলে ১৭৪ জন (১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ), ভোরে ১৪২ জন (১০ দশমিক ২৬ শতাংশ) এবং সন্ধ্যায় ৯৬ জন (৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ) নিহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, বাইপাস সড়ক না থাকায় রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত পণ্যবাহী ভারী যানবাহন রাজধানীতে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। এতে রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ যানজটের কারণে চালকদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যানবাহনের তুলনায় অপ্রতুল সড়ক, একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল, স্বল্প ও দ্রুতগতির যানবাহনের একসঙ্গে চলাচল, ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, প্রয়োজনীয় স্থানে ফুটওভারব্রিজ না থাকা, বিদ্যমান ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণে রাজধানীতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। একই সঙ্গে বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বিত বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাতে দুর্ঘটনা কমানো যাবে।