২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ এখন অতীত। তবে আবার এত পুরোনোও নয় যে সেই বিশ্বকাপের ঘটনা সবাই এত দ্রুত ভুলে যাবেন। তাছাড়া জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ এতটাই ঘটনাবহুল যে চাইলেও কেউ ভুলতে পারবেন না। এবার আর্জেন্টিনার বর্তমান অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ান রোমেরো সেই বিশ্বকাপের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এনেছেন।
১৯ জুলাই নিউজার্সির ফাইনালে আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে থাকলেও রোমেরো পুরো ৯০ মিনিট খেলতে পারেননি। খেলেছিলেন ৭০ মিনিট। কেন ম্যাচের পুরোটা সময় খেলতে পারেননি—তিন মাস পর এক সাক্ষাৎকারে ঘটনা খোলাসা করেছেন তিনি। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের (সেমিফাইনাল) পর আমার অ্যাকিলিস টেন্ডনে সমস্যা হয়েছিল। এখনো সেই সমস্যা রয়েছে। ফাইনালের আগের দিনগুলোতে তেমন অনুশীলনই করতে পারিনি। কয়েকটি ওষুধ ও একটি ইনজেকশন নিয়ে কোনোমতে খেলার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে (ফাইনাল) আর ধকল সহ্য করতে পারিনি।’
চোট নিয়ে খেলতে নামতে হয়েছিল বিশ্বকাপের সময় কিছুটা বিরক্তও ছিলেন রোমেরো। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচ হওয়ায় আর না করতে পারেননি। দলের স্বার্থে তখন খেলেছিলেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বলেন, ‘শরীর তখন খুব একটা ভালো ছিল না। সে সময় মাঠে নামার কারণে খুব রাগ হচ্ছিল। আপনি সব সময়ই এমন ম্যাচে খেলতে চান। ফাইনালে তো আর না বলার সুযোগ নেই। তবে যদি মনে হতো, আমার কারণে দলের ক্ষতি হবে। কারণ, ডিফেন্ডার হিসেবে প্রতিপক্ষ দলের কাউকে আটকাতেই পারছি না, তাহলে আমি নিজেই সরে দাঁড়ানোর কথা জানাতাম। যাতে অন্য কেউ আমার চেয়ে ভালো পারফর্ম করতে পারে। কিন্তু মনে হয়েছিল, খেলতে প্রস্তুত। সে কারণেই খেলেছিলাম।’
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার আট ম্যাচের মধ্যে সাতটিতেই খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন রোমেরো। জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটা তাঁকে কাটাতে হয়েছিল বেঞ্চে বসে। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে খেলার সুযোগ পাওয়ায় রোমেরো আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আর্জেন্টিনার বর্তমান অধিনায়ক বলেন,
‘প্রথমেই আমি স্কালোনিকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। কারণ, তিনি আমাকে বিশ্বকাপের দলে রেখেছিলেন। অন্য কোনো কোচ হলে হয়তো শুরুতেই বাদ দিতেন। কিন্তু তিনি আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন।’
বিশ্বকাপের আগমুহূর্তে হাঁটুতে এমন এক চোট পেয়েছিলেন, তাতে তাঁর টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলেছিলেন। নিজেকে পুরোটা নিংড়ে দিয়েছিলেন। একটি গোল করেছিলেন। অ্যাসিস্ট করেছিলেন এক গোলে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সময়ের ভয়াবহ ঘটনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন রোমেরো। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার বলেন, ‘হাঁটুতে চোট পাওয়ার পর কাঁদছিলাম। তখন মাথায় প্রথম যে চিন্তাটি এসেছিল, তা হলো—আমার বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেল। চোট অনেক বেশি গুরুতর মনে হয়েছিল। দুই দিন পর স্ক্যান করানোর পর জানতে পারলাম, হাঁটুর মিডিয়াল কোল্যাটেরাল লিগামেন্টে (এমসিএল) চোট লেগেছে। সবকিছু বিবেচনায় তখন মনে হয়েছিল, হয়তো শেষ ষোলো কিংবা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলতে পারব।’
শুধু রোমেরো একাই নন, তাঁর সতীর্থরাও বিশ্বকাপের সময় চোটে পড়েছিলেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ২৮ বছর বয়সী ডিফেন্ডার বলেন, ‘টুর্নামেন্ট চলাকালে আমাদের অনেকেই চোটে পড়েছিল। লেয়া (পারেদেসের) পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। অথচ এ নিয়ে কেউ কথা বলেন না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর টেন্ডনের চোটের কারণে অনুশীলন করতে পারিনি। লিসান্দ্রো (মার্তিনেজের) অবস্থাও একই ছিল। মোলি (নাহুয়েল মলিনা) চোটে পড়েছিল। তালিয়াফিকোও পুরোপুরি ফিট ছিল না। আর দিবুর (এমিলিয়ানো মার্তিনেজের) আঙুল ভাঙা ছিল। তারপরও নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছি।’
১৯ জুলাই নিউজার্সির ফাইনালে হারের পর ক্যামেরার লেন্স যখন লিওনেল মেসির দিকে তাক করা হয়েছিল, তখন তাঁর চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছিল পানি। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’র সময় তিনি ছিলেন অধিনায়ক। ৩১ আগস্ট সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে অবসরের ঘোষণা দিলেও ৭ অক্টোবর বেনিন ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিদায় বলেন তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২১ বছরের ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ ২০৮ ম্যাচ খেলেছেন মেসি। দলটির জার্সিতে সর্বোচ্চ ১২৬ গোলও তাঁর। অ্যাসিস্ট করেছেন ৬৯ গোলে।