সীমানা পিলারটিতে লেখা আছে ইস্ট ইন্ডিয়া ১৮১৮। পাওয়া গেছে এক মাদকসম্রাটের বাড়িতে। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে মাদকসম্রাট রূপ মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিলেন স্থানীয় মাদকবিরোধী সংগঠনের যুবকেরা।
তাঁর বাড়িতেই পাওয়া যায় এই লোহার বস্তুটি। মাদকসম্রাটের বাড়িতে কী করে এই ঐতিহাসিক বস্তুটি এল, তা জানা না গেলেও এটি যে ইতিহাসের একটি অংশ, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ কথাটি শুনলেই প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনের কথা মনে পড়ে যায়। ১৭৫৭ সালে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হন, তখন থেকেই ইংরেজরা এ দেশে জেঁকে বসে। ইংরেজদের সঙ্গে মিলে বাংলার বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কারণে সিরাজের পতন ঘটে। এরপরের ইতিহাসে একে একে কত যে সংগ্রাম লিপিবদ্ধ আছে, তার শেষ নেই। বারবার বিদ্রোহ হয়েছে, ইংরেজরা সে বিদ্রোহ শক্ত হাতে দমন করেছে। কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহসহ সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল দেশবাসী। সেসব কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। ১৮৫৭ সালে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যে সংগ্রাম করেছিল সিপাহিরা, তাকে স্বাধীনতাসংগ্রামের অংশ বলা হয়।
নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এ দেশে আন্দোলন তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। ইংরেজরা হিন্দু-মুসলমানকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর থেকে সাম্প্রদায়িক বিরোধ বাড়তে থাকে। মনে রাখা দরকার, রাজায় রাজায় যে যুদ্ধ হয়েছে, তাতে দেশের মেহনতি মানুষ অংশ নেননি। একই ধরনের কর্মজীবী হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্পর্কও খারাপ হয়নি। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীতে এসে এই দুই সম্প্রদায় যে পরস্পরের ব্যাপারে অসহনশীল হয়ে উঠল, তার দায় মূলত ইংরেজদের। দুঃখের বিষয়, মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের এখনো পরস্পরের বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছে একশ্রেণির মতলববাজ।
ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে হলো শুধু এই কারণ যে লোহার এই বস্তুটি হয়তো নিরেট এক জড় বস্তু। কিন্তু ইতিহাসের বহমানতার সঙ্গেও তার একটা সম্পর্ক রয়েছে। ১৮১৮ সাল খোদাই করা আছে তাতে। অর্থাৎ এই বস্তুটি যখন তৈরি হয়েছে, তখনো ভারতবর্ষের ইতিহাস কোন দিকে গড়াবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এরই মধ্যে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের মাধ্যমে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। পুরোনো জমিদারদের জায়গায় এসেছে নতুন জমিদার। এই জমিদারেরা উঠে এসেছে ইংরেজদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে ব্যবসা করে। কৃষকদের চেয়ে তাদের কাছ থেকে আদায়কৃত খাজনার প্রতিই ছিল যাদের দৃষ্টি।
ইংরেজরা চলে গেছে। যেতে বাধ্য হয়েছে। বঙ্গভঙ্গের পর লক্ষ্ণৌ চুক্তি, স্বরাজ আন্দোলন, বেঙ্গল প্যাক্ট। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বানিয়ে দিয়ে ব্রিটিশদের চলে যাওয়া!
১৮১৮ সাল অঙ্কিত এই লৌহখণ্ডটি ইতিহাসের অংশ। এটি যখন দেখবে মানুষ, তখন ইতিহাসের পাঠও গ্রহণ করবে—এই আশা আমাদের।