হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিড়ম্বনাময় এবারের ঈদযাত্রা

মামুনুর রশীদ নাট্যব্যক্তিত্ব

অন্য কোনো দেশের রাজধানীতে উৎসবের মৌসুমে এ রকম উচ্ছৃঙ্খল যাত্রা হয় কি না, তা অনেকেরই প্রশ্ন। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিটি ঈদেই পথে নানা ধরনের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায়, ব্যাপক যানজট হয়—এ যেন আমাদের অমোঘ নিয়তি। এবারের ঈদযাত্রায় আমি নিজেই শুধু সাক্ষী নই, একজন ভুক্তভোগীও। ২৬ মে সকাল ১০টায় ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। মাত্র দুই ঘণ্টার পথ। টঙ্গী, গাজীপুর পার হতে তেমন একটা সময় লাগল না।

কিন্তু যানজটটা শুরু হলো কোনাবাড়ী থেকে। ফ্লাইওভারের ওপর ও নিচে দুই জায়গাতেই গাড়িতে ঠাসা। অধিকাংশ গাড়ি উত্তরাঞ্চলের দিকের। গাড়িচালক সিদ্ধান্ত নিলেন ডান দিকে একটা রাস্তা আছে বেশ ভালো, সেটা দিয়ে সহজে কালিয়াকৈর যাওয়া যায়। সেই সুযোগ নিতে গিয়ে কিছু দূর বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই যাওয়া গেল। কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে গাড়ি একেবারে থমকে দাঁড়াল। বোঝা গেল পথের দুই ধারে বেশ কিছু কলকারখানা। কারখানার শ্রমিকেরা আজকেই হয়তো বেতন-বোনাস পেয়েছেন। তাঁরা রিজার্ভ গাড়িতে করে গ্রামে ফিরবেন। অনেক রিজার্ভ গাড়ির কারণে সড়কের অনেকখানি দখল হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আবার আমরা প্রধান সড়ক দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আবার সেই তীব্র যানজট। এত প্রশস্ত রাস্তাতেও গাড়ির সংকুলান হচ্ছে না। শম্বুকগতিতে গাড়ি চলতে চলতে বিকেল ৫টা বেজে গেল। চন্দ্রা পার হয়ে কালিয়াকৈর আসা সম্ভব হলো। এরই মধ্যে নানা ধরনের গুজব মুখে মুখে ফিরছে।

চন্দ্রা একটি ত্রিমোহনী এলাকা। ঢাকা থেকে আবদুল্লাহপুর হয়ে গাড়িগুলো চন্দ্রায় আসে এবং উত্তরবঙ্গের দিকে যাত্রা করে। অন্য আরেকটি পথ হচ্ছে ঢাকা থেকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী হয়ে চন্দ্রার ফ্লাইওভার পার হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাত্রা। গুজব বলছে, আবদুল্লাহপুর হয়ে আসা গাড়িগুলোকে ওখানকার ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ পার করে দিচ্ছে। কিন্তু গাজীপুর, কোনাবাড়ীর গাড়িগুলোকে আটকে রাখছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ঢাকা থেকে গাজীপুর কোনাবাড়ী হয়ে যে পথটি চন্দ্রায় মিশেছে, সেখানে কোনো ধরনের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নেই, হাইওয়ে পুলিশেরও দেখা পাওয়া গেল না। কিন্তু চন্দ্রায় এসে বিপুলসংখ্যক পুলিশের সমাগম দেখতে পেলাম। সারা পথেই হাজার হাজার ঈদযাত্রী। অধিকাংশ মানুষই হেঁটে রওনা দিয়েছেন।

মনে হলো দিনাজপুর, পঞ্চগড় পর্যন্ত হেঁটেই তাঁরা যাবেন। তবু বাড়ি যাওয়া চাইই। চন্দ্রায় এসে দেখা গেল লোকে লোকারণ্য। সারা দিন কিছু খাওয়া হয়নি। সামনে একটা রেস্তোরাঁ পাওয়া গেল। রেস্তোরাঁর মালিক, শ্রমিকেরা সাদর আমন্ত্রণে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। খাবারের মধ্যে শুধু আছে ভাত, মাছ ও মাংসের তরকারি। খাবারের চেহারা দেখে মনে হলো মাংস খাওয়াটাই সমীচীন হবে। অল্প একটু খেয়েই আমরা আবার পথে নামলাম। আবারও শম্বুকগতি।

টাঙ্গাইল পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮টা বেজে গেল। হিসাব করে দেখলাম ২ ঘণ্টার রাস্তা যেতে ১০ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। কিন্তু যাঁরা উত্তরবঙ্গের দিকে যাবেন, তাঁরা কখন বাড়িতে পৌঁছাবেন, তা অনিশ্চিত। কারণ, এর মধ্যে এলেঙ্গা ও যমুনা সেতুতে একেবারেই স্থবির অবস্থা। মানুষ যাচ্ছে বাসে, বাসের ওপরে, খোলা ট্রাকে, ছোট পিকআপ ভ্যানে, মোটরসাইকেলে। তিন চাকার অটোতেও যাত্রা করেছে। এই দুর্বিষহ ঈদযাত্রায় কিছুটা অসুস্থতাবোধ করলাম। একটুখানি রাতে পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে গেলাম। বন্ধু চিকিৎসকেরা এলেন। বিনিদ্র রাত কাটল প্রচণ্ড ব্যথায়। ২৭ মে এভাবেই কাটল। ২৮ মে ঈদ। রাত ও দিনের দুঃসহ যন্ত্রণা ভুলে স্থানীয় একটি হাসপাতালে আশ্রয় নিলাম। ডাক্তার দেখেশুনে কিছু চিকিৎসা দিলেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না। পরদিন আরেকটি হাসপাতালের শরণাপন্ন হলাম। হাসপাতালের লোকসংখ্যা একেবারে কম। মাত্র তিনজন স্টাফ আছে। ডাক্তারদের উপস্থিতিও তাই। অবশেষে একজন অধ্যাপক এলেন। তিনি অবলীলায় বলে দিলেন এ অবস্থায় ঢাকায় ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। তাই আবার ঢাকার পথে রওনা হলাম। ঢাকার একটি খ্যাতনামা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হলাম। তিন দিন অশেষ কষ্ট ভোগ করে অবশেষে ঘরে ফিরে এলাম।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ তো গেল শারীরিক অসুস্থতার কথা। কিন্তু যাঁরা বাড়ি পৌঁছালেন এবং তাঁরা কেমন করে ঢাকায় ফিরে আসবেন? আমার মতো অসুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন কি না, এটা একটা ভাবনার বিষয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে! ঈদযাত্রা তাহলে কি মরণযাত্রা নয় কি?

বিপুলসংখ্যক মানুষের এই ঈদযাত্রা দেখে মনে হয়েছে মাত্র দুই মাস আগেই আরেকটি ঈদ হয়ে গেছে, সেখানেও চরম ভোগান্তির যাত্রা ছিল। আসলে এই উপর্যুপরি ঈদযাত্রা কেন? পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের রাজধানীতে এই ধরনের ঈদযাত্রা হয় কি না আমার জানা নেই। হতে পারে এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ যে ঈদ গ্রামের বাড়িতেই করতে হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে একটি ভিন্ন বিষয়। যে দম বন্ধ করা, নোংরা এবং দূষিত আবহাওয়ায় শ্রমিকেরা জীবনযাপন করেন, সেখান থেকে তাঁরা মুক্তি চান। গ্রামীণ পরিবেশে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ কাটানো একটা সাময়িক মুক্তি এনে দেয় তাঁদের জীবনে। শ্রমিকেরা যেখানে বসবাস করেন সেখানে যদি একটুখানি ভালোভাবে নিশ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে পরিস্থিতিটা পাল্টে যেতে পারত। হয়তো গ্রাম থেকেই আত্মীয়স্বজনেরা এসে একত্র হয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারতেন। কিন্তু সেই উপায় নেই। কারখানাগুলো প্রতিবছরই ঈদের আগে বেতন-বোনাস দিতে সমস্যার সৃষ্টি করে। আর অধিকাংশ মালিক ঈদের আগের দিনই সেটা দিয়ে থাকেন। গত কয়েকটি ঈদ ধরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু কিছু কারখানা ধিকি ধিকি করে চলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। আমাদের দেশের লাখ লাখ নারী শ্রমিক গার্মেন্টসের কারণে গৃহস্থালির দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মুক্তির পথটি আরও প্রলম্বিত হতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও উড়ে এসে জুড়ে বসা শাসকদের কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ তো গেল শ্রমিকদের কথা। নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরা এ সময়গুলোতে গ্রামে যুক্ত হন একটু মুক্ত পরিবেশে বাঁচার জন্য। কারণ, এই শহরটার মতো দেশের বড় শহরগুলোকে আমরা উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে পারিনি। দেশের অসংখ্য নদী, খাল, ধ্বংস হয়ে গেছে। নদীপথের দীর্ঘ যাত্রা ছেড়ে সড়কপথকেই এখন সবাই বেছে নেয়। বরাবরের মতো নদীপথগুলো এখন থমকে পড়েছে। যাতায়াতের ভাড়ার কথা চিন্তা করলেও সেই পথগুলো সুলভ নয়। তা ছাড়া, ঢাকা শহরের যানজট পেরিয়ে সদরঘাটের বিশৃঙ্খল পরিবেশকে অনেকেই ভয় পান।

এই বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠী আগে থেকে কোনো চিন্তাভাবনা করেনি, করার পরিকল্পনাও ছিল না। রাজনীতিবিদ, আমলা, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা গত ৫৫ বছরে বিপুলভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। নিজেরা তো বটেই, সন্তানসন্ততিদেরকেও এ দেশে বসবাসের কথা ভাবেননি। এমনকি এখনো ভাবছেন না। অধিকাংশ লোকের মাথায় একই চিন্তা, একই স্বপ্ন—অভিবাসন। পাশাপাশি যেকোনোভাবেই হোক অর্থ উপার্জন এবং অর্থ পাচার করাই যেন চূড়ান্ত লক্ষ্য। অথচ ঈদের আগে বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতার অভাব দেখা যায় না। আর কোরবানির আগে গরুর হাটগুলোতে যে পরিমাণ পশু ক্রয়-বিক্রয় হয়, তাতে দেশে যে একটা বড় অর্থনীতি আছে তা সহজেই বোঝা যায়।

অবকাঠামোগত একটা উন্নয়ন হয়েছে বটে। কিন্তু একে ব্যবহার করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এখানেও শুধু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। চালকেরা নিজ বোধ থেকে কোনো অবস্থাতেই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালান না। অন্য চলাচলকে সাহায্য করেন না। চালকেরা যেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। বর্তমানে এআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থাকেও বন্ধ করার জন্য তাঁরা স্কচটেপ দিয়ে নেমপ্লেট বন্ধ করার বুদ্ধি বের করেছেন। এই ব্যাপারগুলো নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনসাধারণ তো দূরের কথা, নিজেদের কর্মীদেরও কোনো ধরনের নিয়মনীতির শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দেয় না। সমাজে বিরাজমান একেবারে তুচ্ছ দ্বন্দ্বকেও নিরসন করার কোনো উপায় বের করতে পারেনি। কিন্তু রাষ্ট্র স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে একেবারে আইন সভা পর্যন্ত বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। আর জনগণের রাজস্বে তারা লুটপাটের শিক্ষাই পেয়েছে, কিন্তু কোনো জনহিতকর কাজের সুবুদ্ধি গ্রহণ করেনি। কত টাকা সংসদ সদস্য ও আমলাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার জন্য ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। স্থানীয় সরকারের একজন চেয়ারম্যান বা মেম্বার কত টাকার মালিক। কিন্তু মানুষের জীবনযাপনকে স্বাচ্ছন্দ্য করার জন্য কোনো উদ্যোগ তাঁরা গ্রহণ করেননি। যতই গণতন্ত্রের কথা বলি, সুশাসনের কথা বলি, কোনো কিছুতেই কিছু হবে না। যদি মানুষের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন না হয়। সেই জন্য কি আমরা কোনো শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছি? করিনি। মিডিয়া কি তার সঠিক দায়িত্ব পালন করছে? নির্বোধ প্রাণী গাধা সব সময়ই পানির কাছে যায় নিজের চেহারা দেখার জন্য। আমাদের পানির কাছে যেতে হবে না, একটু আয়নার সামনে দাঁড়ালেই হবে।

সংস্কৃতি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি

উষ্ণ পৃথিবীর শীতল সতর্কতা

মবের শাসন, মানুষের ভয়, রাষ্ট্রের নীরবতা

শিশুর নিরাপত্তায় সরকারের অবস্থান কী

যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউরোপ কি এগিয়ে আসবে

স্বাধীনতাসংগ্রামের একজন কিংবদন্তি

সমীকরণ বদলাবে কি আঞ্চলিক সম্পর্কের

বাংলাদেশের অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ

অভ্যন্তরীণ উপাচার্য নিয়োগ কেন দরকার

একজন প্রকৃত মানুষ