হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ক্ষমতা, নৈতিক স্খলন ও নারীর মর্যাদা

মো. রুহুল আমিন

প্রতীকী ছবি

কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও বদলে দিল অসংখ্য মানুষের ফেসবুক টাইমলাইন। মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এলেন ভিডিওতে থাকা প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি এবং তাঁর তরুণী সঙ্গী। শুরু হলো প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন, ব্যাখ্যা আর প্রতিব্যাখ্যার ঝড়।

কে এই তরুণী? তাঁদের সম্পর্ক কী? কেন এই ভিডিও ঘিরে এত বিতর্ক? কিছুক্ষণের মধ্যেই জনপ্রতিনিধির দলকানা ভক্তদের পক্ষে দাবি করা হলো, ভিডিওটি এআই দ্বারা নির্মিত। আবার পরদিন জনপ্রতিনিধি দাবি করলেন তরুণী তাঁর বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী। কিন্তু বিতর্ক সেখানেই থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে শুরু করল চাকরির জন্য জমা দেওয়া জনপ্রতিনিধির সুপারিশকৃত একটি জীবনবৃত্তান্ত, যেখানে তরুণীকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামনে এল কাবিননামা, সুপারিশপত্র, তরুণী এবং জনপ্রতিনিধির বয়সের পার্থক্য ও আরও কিছু নথি। প্রতিটি নতুন তথ্য যেন আগের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আরও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিল। কোনটি সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর তথ্য আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার—সেটি তদন্তেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু এই ঘটনায় মানুষের মনে যে প্রশ্নগুলো জন্ম নিয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াও সহজ নয়।

এর কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে অভিযোগ শোনা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় এক নেতা কেন্দ্র থেকে আসা এক প্রভাবশালী নেতাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে ১৪-১৫ বছর বয়সী কিশোরী খুঁজছিলেন। অডিওতে একজন নারীকে একটি অসচ্ছল পরিবারের মেয়ের কথা বলতে শোনা যায়।

দুটি ঘটনা, দুটি ভিন্ন সময়, দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। কিন্তু দুটি ঘটনার মাঝখানে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমাদের সমাজে ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাবের কাছে একজন দরিদ্র বা অল্পবয়সী নারীর স্বাধীনতা আসলে কতটা নিরাপদ? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—ক্ষমতার সঙ্গে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য যুক্ত হয়, তখন একজন নারীর সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন থাকে? বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যে ভয়াবহ নৈতিক স্খলন ও পচন ধরেছে, এটি তারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ নয় কি?

ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই নিজেদের আইন ও নীতি-নৈতিকতার ঊর্ধ্বে মনে করেন। পদ-পদবি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে তাঁরা পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কাম-লালসা চরিতার্থ করার হাতিয়ারে। এই নারীঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়াও ক্ষমতার দাপটে তৈরি হওয়া একধরনের বেপরোয়া মানসিকতার ফসল। তাঁরা মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকলে যেকোনো অপরাধ বা অনৈতিক আচরণকে ‘এআই প্রযুক্তি’, ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ কিংবা মেকি ‘বৈধতার’ অজুহাতে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব।

আইন হয়তো বলবে, প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান আর বাস্তবতা প্রশ্ন করতে শেখায়—সিদ্ধান্তটি কি সত্যিই চাপ, নির্ভরশীলতা, প্রভাব কিংবা প্রলোভন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল? একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, যার পরিবারের অভাব রয়েছে, যার একটি চাকরি তার পুরো পরিবারের ভাগ্য বদলে দিতে পারে—সে কি সব সময় প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় থাকে? ক্ষমতা যখন একদিকে, আর অভাব অন্যদিকে দাঁড়ায়, তখন ‘সম্মতি’ শব্দটির অর্থও অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে।

আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য দরিদ্র নারী চাকরি, পদোন্নতি, আর্থিক সহায়তা কিংবা নিরাপত্তার আশায় বিভিন্ন ক্ষমতাবান ব্যক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন। আর এই সুযোগটিই নেন ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ক্ষমতার অসমতা ও নেতৃত্বের নৈতিক স্খলন এমন একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে নারী শোষণের সুযোগ অনায়াসে তৈরি হয়। আর সেই সুযোগই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

আমরা সমস্যার মূল কারণ নিয়ে খুব কম কথা বলি। বরং আলোচনা আটকে যায়—কে কোন দলের, কার ভিডিও, কার অডিও, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ—এসবে। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুপারিশ ছাড়া অনেকের কাছে একটি ছোট চাকরি অধরা মনে হবে? কেন সমাজে এমন বৈষম্য থাকবে, যেখানে ক্ষমতা ও অনৈতিকতা মানুষের মর্যাদার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?

এই বাস্তবতা বদলাতে দরকার এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে কেউ চাকরি পাওয়ার জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবেন না। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে নেতৃত্ব যখন নৈতিকভাবে স্খলিত হয়, তখন গোটা সমাজের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। মানুষের আস্থা একবার ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করা খুব কঠিন।

স্মৃতির পাতায় সপ্তম মাস

মুখস্থ করাই প্রকৃত শিক্ষা নয়

একটি মৃত্যুদণ্ড ও ৭১ বছর পর বিচারিক ভুল সংশোধন

গণতান্ত্রিক ভারতের অগণতান্ত্রিক আচরণ

‘ন’-এর ব্যবধান

সুকুকের সাফল্যের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী

ঝিনাইদহের লজ্জা

উত্তাল বেলুচিস্তান: পাকিস্তান কি আরেকটি ১৯৭১-এর ছায়ার মুখোমুখি

পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে না