কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মাস কোনটি? আমি নির্দ্বিধায় বলব, ২০২৪ সালের জুলাই। ক্যালেন্ডারের হিসাবে এটি বছরের সপ্তম মাস—মাত্র ৩১ দিনের। কিন্তু অনুভূতির হিসাবে যেন কয়েক যুগের সমান। এই এক মাসে আমি দেখেছি মানুষের সাহস, ভয়, কান্না, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ এবং আশার এক বিরল সম্মিলন। দেখেছি কীভাবে একটি যৌক্তিক দাবি ধীরে ধীরে আপামর জনগণের প্রাণের দাবিতে মিলিয়ে গিয়ে একটি গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকে। তারা বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। শুরুতে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে ছিল স্লোগান, চোখে ছিল একটি ন্যায্য বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাদের বিশ্বাস ছিল, যুক্তির ভাষা রাষ্ট্র শুনবে। কিন্তু ইতিহাসের অনেক মোড়ের মতো এখানেও বাস্তবতা খুব দ্রুত বদলে যায়। উত্তেজনা বাড়তে থাকে, সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আহত ও নিহত হওয়ার খবর আসতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই রক্তাক্ত ছবি, হাসপাতালের করিডরে স্বজনের কান্না, নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে মা-বাবার আকুতি—এসব দৃশ্য আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে অস্বাভাবিক করে তুলেছিল। তখন একটি প্রশ্নই বারবার মাথায় আসছিল—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের কণ্ঠ কি এমন পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কথা?
জুলাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু। তাঁর মৃত্যু দেশজুড়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। এরপর উত্তরায় আহত শিক্ষার্থীদের জন্য পানি ও বিস্কুট নিয়ে যাওয়ার সময় নিহত হন মীর মুগ্ধ। মানবিকতার এই নির্মম পরিণতি হাজারো মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আরও হৃদয়বিদারক ছিল মাত্র চার বছর বয়সী আব্দুল আহাদের মৃত্যু। একটি শিশুর প্রাণহানি পুরো জাতিকে নতুন করে প্রশ্ন করেছিল—সহিংসতার শেষ সীমা কোথায়? দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, আহত হওয়া এবং প্রাণহানির খবর আসতে থাকে।
আমি সেই সময় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—একটি জাতির ইতিহাস কেবল ক্ষমতার করিডরে লেখা হয় না; লেখা হয় হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করা মায়ের চোখের জলে, রক্তদানের সারিতে দাঁড়ানো অচেনা তরুণের দায়িত্ববোধে এবং ন্যায়বিচারের আশায় বুক বাঁধা মানুষের সাহসে। আমি আজও ভুলতে পারি না সেই মায়েদের মুখ। যাঁরা দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, হয়তো এই বুঝি তাঁদের সন্তান ফিরে এল। কিন্তু অনেক স্বপ্ন সেই দিনগুলোতে থেমে গিয়েছিল নিস্তব্ধ কোনো কবরস্থানে।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ছেড়ে চলে যান। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। কেউ এই ঘটনাকে গণ-আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে দেখেছেন, কেউ রাজনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি মোড়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বহু বছর ধরে বিশ্লেষণ করবে।
আমার কাছে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। আমার কাছে জুলাই মানে আবু সাঈদের সাহস, মীর মুগ্ধর মানবিকতা এবং ছোট্ট আব্দুল আহাদের অসমাপ্ত শৈশব। আমি বিশ্বাস করি, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার ন্যায়বিচারে। জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের গল্প নয়; ইতিহাসে স্থান পায় সেই মায়ের নীরব কান্না, সেই বাবার দীর্ঘশ্বাস, সেই চিকিৎসকের ক্লান্ত চোখ, সেই রিকশাচালকের মানবিকতা এবং সেই অচেনা রক্তদাতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
সময়ের প্রবাহে ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যায়, কিন্তু আত্মত্যাগের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে কিছু অপ্রকাশিত কান্না, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন, কিছু নামহীন সাহসের গল্প। জুলাইও তেমনই এক অধ্যায়, যেখানে প্রতিবাদের ভাষা, মানবিকতার পরীক্ষা এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে ইতিহাস রচনা করেছে।
জুলাইয়ের রক্তঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা এবং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের মর্যাদা হবে সর্বোচ্চ।