হোম > ইসলাম

ওমরাহ করার নিয়ম: ইহরাম থেকে তাওয়াফ পর্যন্ত পূর্ণ গাইড

হাফেজ মাওলানা আজিজুল হক

পবিত্র কাবা প্রদক্ষিণ করছেন মুসল্লিরা। ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণে ওমরাহ পালন করা প্রতিটি মুমিনের জীবনের অন্যতম পরম সৌভাগ্য ও কাঙ্ক্ষিত ইবাদত। ওমরাহ আত্মশুদ্ধি, তাওবা এবং আল্লাহর ঘরের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশের অনন্য এক মাধ্যম।

সঠিক জ্ঞান, প্রস্তুতি ও সুন্নাহসম্মত পন্থায় ওমরাহ সম্পন্ন করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। ওমরাহর প্রস্তুতি থেকে শুরু করে এর রুকনসমূহ এবং জরুরি মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড নিচে তুলে ধরা হলো:

অধ্যায় ১: ওমরাহ পালনের প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র

ওমরাহ সফরে যাওয়ার আগে প্রশাসনিক, শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সফর শুরুর পূর্বে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত:

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

  1. বৈধ পাসপোর্ট (সৌদি আরবে প্রবেশের সময় পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস থাকা প্রয়োজন)।
  2. সৌদি আরবের অনুমোদিত ওমরাহ ভিসা।
  3. কনফার্মড বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের কাগজ।
  4. জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট ও ভিসার একাধিক ফটোকপি।

যা যা সঙ্গে রাখবেন

পুরুষদের জন্য: দুই সেট সেলাইবিহীন সাদা ইহরামের কাপড় ও ইহরামের উপযোগী ফিতেযুক্ত স্যান্ডেল।

নারীদের জন্য: শালীন ও পর্যাপ্ত আরামদায়ক ঢিলেঢালা পোশাক, হিজাব ও ওড়না।

সাধারণ সামগ্রী: মোবাইল, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, ছোট ব্যাগ, জুতা রাখার ব্যাগ, সুগন্ধিবিহীন সাবান-শ্যাম্পু, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং একটি নির্ভরযোগ্য দোয়া ও মাসায়েলের বই।

অধ্যায় ২: ওমরাহর প্রধান ৪টি কাজ

ওমরাহ সম্পন্ন হওয়ার মূল কাজ মূলত চারটি। এই কাজগুলো সঠিক নিয়মে সম্পন্ন করলেই ওমরাহ পূর্ণ হয়:

  • ইহরাম বাঁধা ও নিয়ত করা।
  • পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করা।
  • সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সায়ি করা।
  • মাথা মুণ্ডন করা অথবা চুল ছোট করা।

অধ্যায় ৩: ইহরাম বাঁধার নিয়ম ও তালবিয়া পাঠ

মিকাত অতিক্রম করার আগেই ইহরামের প্রস্তুতি নিতে হবে।

শরীরের পরিচ্ছন্নতা: ভালো করে গোসল করা, নখ ও অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা (ইহরামের নিয়তের আগে)।

পোশাক পরিধান: পুরুষেরা দুই টুকরা সেলাইবিহীন সাদা চাদর পরবেন (ডান কাঁধ খোলা রেখে)। নারীরা তাঁদের স্বাভাবিক শালীন পোশাক পরিধান করবেন (নিকাব ও হাতমোজা পরা নিষিদ্ধ)।

নিয়ত:

ওমরাহর নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা মুস্তাহাব।

নিয়ত: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ফায়াসসিরহা লি ওয়া তাক্বাবালহা মিন্নি।’

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার জন্য ওমরাহর ইচ্ছা করছি, আপনি তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করুন।

তালবিয়া পাঠ:

নিয়তের পর থেকে উচ্চস্বরে (নারীরা নিচু স্বরে) তালবিয়া পড়তে শুরু করবেন এবং মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত এটি পড়তে থাকবেন।

তালবিয়া: ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব কেবল আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।’

অধ্যায় ৪: মসজিদুল হারামে প্রবেশ ও তাওয়াফের নিয়ম

মক্কায় পৌঁছে হোটেলে বিশ্রামের পর ওমরাহর উদ্দেশ্যে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে হবে।

মসজিদুল হারামে প্রবেশের দোয়া

ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে এই দোয়া পড়বেন:

بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ.

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ। আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রাহমাতিক।

অর্থ: ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন।’

প্রথমবার কাবা শরিফ দেখার পর আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করবেন এবং নিজের ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করবেন।

কাবা শরিফ তাওয়াফ

তাওয়াফ হলো পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে চারপাশ দিয়ে সাতবার প্রদক্ষিণ করা।

শুরু:

হাজরে আসওয়াদের বরাবর এসে তাওয়াফ শুরু করতে হবে। সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদে চুমা দেবেন, ভিড় থাকলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলবেন: ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।’

নিয়ম:

কাবা শরিফকে সব সময় বাম পাশে রেখে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে হাঁটবেন। পুরুষেরা প্রথম তিন চক্করে একটু দ্রুত হাঁটবেন (যাকে রমল বলে) এবং ডান কাঁধ খোলা রাখবেন (যাকে বলে ইজতিবা)। অবশিষ্ট চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন।

রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ: রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এই বিশেষ দোয়াটি পড়া সুন্নত—

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: ‘রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ। ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ। ওয়া কিনা আজাবান নার।’

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন। আর জাহান্নামের শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করুন। (সুরা বাকারা: ২০১)

অধ্যায় ৫: দুই রাকাত নামাজ ও জমজমের পানি পান

তাওয়াফ শেষ করার পর মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে (কিংবা হারামের যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে) দুই রাকাত ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামাজ আদায় করবেন। প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া সুন্নত।

নামাজ শেষে তৃপ্তি সহকারে জমজমের পানি পান করবেন এবং এই দোয়া পড়বেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ.

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজকান ওয়াসিআ, ওয়া শিফাআন মিন কুল্লি দাঈ।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সব ধরনের রোগ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করছি।’

অধ্যায় ৬: সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সায়ি

সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার যাতায়াত করাকে সায়ি বলা হয়।

শুরু:

সাফা পাহাড় থেকে সায়ি শুরু করতে হবে। সাফার কাছে পৌঁছে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি পড়া সুন্নত—

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ.

উচ্চারণ: ‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতাম মিন শাআইরিল্লাহ।’

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। (সুরা বাকারা: ১৫৮)

গণনা:

সাফা থেকে মারওয়া যাওয়া হলো ১ বার, আর মারওয়া থেকে সাফা ফিরে আসা হলো ২ বার। এভাবে মোট ৭ বার যাতায়াত করে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে সায়ি শেষ করতে হবে।

বিশেষ নির্দেশনা:

দুই সবুজ বাতি চিহ্নিত নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে পুরুষেরা একটু দ্রুত হাঁটবেন, আর নারীরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন।

অধ্যায় ৭: মাথা মুণ্ডন অথবা চুল ছোট করা (হলক বা কসর)

সায়ি সম্পন্ন করার পর ওমরাহর সর্বশেষ কাজ হলো মাথা মুণ্ডন করা অথবা চুল ছোট করা।

পুরুষদের জন্য:

সম্পূর্ণ মাথার চুল মুণ্ডন করা (হলক) উত্তম; তবে চাইলে সমস্ত মাথা থেকে সমানভাবে ছোট (কসর) করতে পারেন।

নারীদের জন্য:

নারীরা কখনোই মাথা মুণ্ডন করবেন না; বরং চুলের শেষ প্রান্ত থেকে আনুমানিক এক ইঞ্চি পরিমাণ চুল কেটে ফেলবেন।

এই কাজটি সম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার ওমরাহ পূর্ণ হয়ে যাবে এবং ইহরামের যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। এরপর আপনি স্বাভাবিক পোশাক পরতে পারবেন।

অধ্যায় ৮: ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ নিষিদ্ধ

ইহরাম বাঁধার পর থেকে হালাল হওয়া পর্যন্ত কয়েকটি বিষয় থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে:

  1. শরীরের যেকোনো অংশের চুল বা নখ কাটা।
  2. সুগন্ধি বা সুগন্ধযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা।
  3. স্বামী-স্ত্রীর সহবাস বা যৌন উত্তেজনামূলক আচরণ করা।
  4. স্থলভাগের কোনো বন্য প্রাণী শিকার করা বা ক্ষতি করা।
  5. ঝগড়া-বিবাদ ও অশোভন আচরণ করা।
  6. পুরুষদের সেলাই করা পোশাক পরা ও মাথা বা মুখ ঢাকা।
  7. নারীদের নিকাব ও হাতমোজা পরা (প্রয়োজনে পর্দার জন্য কাপড়ের আড়াল করা যায়)।

অধ্যায় ৯: ওমরাহ সফরে সাধারণ কিছু ভুল ও সতর্কতা

মিকাত অতিক্রম:

ট্রেন বা বিমানে ভ্রমণের সময় মিকাত অতিক্রম করার আগেই ইহরামের নিয়ত ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

তাওয়াফের হিসাব গুলিয়ে ফেলা:

সাত চক্করের হিসাব সঠিকভাবে রাখতে হবে, সন্দেহ হলে কমটি ধরে হিসাব মেলাতে হবে।

ভিড় এড়িয়ে চলা:

হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার জন্য অতিরিক্ত ধাক্কাধাক্কি করে অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

নির্দিষ্ট দোয়ার বাধ্যবাধকতা:

তাওয়াফ বা সায়ির প্রতিটি চক্করের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দোয়া আবশ্যক নয়; নিজের মাতৃভাষায় যেকোনো কল্যাণকর দোয়া করা যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক ও সুন্দরভাবে ওমরাহ পালনের তৌফিক দান করুন।

নিরাপদ সড়ক গড়তে ইসলামের নির্দেশনা

সকাল-সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও আমল

আজকের নামাজের সময়সূচি: ০৮ নভেম্বর ২০২৬

বৃষ্টি হওয়ার সময় পড়ার দোয়া

রিজিক বৃদ্ধির দোয়া

খাবার শেষে পড়ার দোয়া

সন্তান প্রতিপালনে মা-বাবার দায়িত্ব

আজকের নামাজের সময়সূচি: ০৭ নভেম্বর ২০২৬

শীতকালের ইবাদতের প্রস্তুতি

ধারের টাকা পরিশোধে টালবাহানা: ইসলামের সতর্কবার্তা