হোম > ইসলাম

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)

আবদুল আযীয কাসেমি

ইতিহাসের এক কঠিন সন্ধিক্ষণে মানবতার আকাশে উজ্জ্বল ধ্রুবতারার মতো আবির্ভাব ঘটেছিল মুহাম্মদ (সা.)-এর। অন্যায়-অনাচারে ভরে গিয়েছিল পুরো পৃথিবী। চারদিকে অধিকারবঞ্চিত মানুষের তীব্র হাহাকার ছিল। মজলুমের আহাজারিতে ভারী হয়ে ছিল আকাশ-বাতাস। গলাকাটা প্রাণীর মতো তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে নিগৃহীত নারীসমাজ। দাসদাসীদের ওপর যেখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল জুলুমের হিমালয়। এমন এক সঙিন মুহূর্তে পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে পাঠিয়েছেন।

মহানবী (সা.) তখনো নবী হননি। তবে নিজের অনন্য গুণ বলে তত দিনে মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। আরবের মানুষ তাঁকে ‘আল আমিন’ বা ‘বিশ্বস্ত’ আখ্যায়িত করেছিল। মক্কায় নিপীড়িতের অধিকার রক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু যুবক সংঘবদ্ধ হয়ে মুষ্টিবদ্ধ শপথ করেছিলেন। এ সংঘের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণখচিত হয়ে আছে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে। মহানবী (সা.) ছিলেন এই মহান সংগ্রামীদের একজন।

ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি এতই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে জীবনের কঠিন থেকে কঠিনতম মুহূর্তেও তা থেকে সামান্য বিচ্যুত হননি। নবীজির প্রিয় চাচা হামজা বিন আবদুল মুত্তালিবের হন্তারক ওয়াহশি যখন ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন, তিনি তাঁর ভয়াবহ অপরাধও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাঁকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তা করেননি।

হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় যখন সাহাবায়ে কেরাম প্রতিশোধ চেতনায় উন্মুখ ছিলেন, তখনো তিনি প্রতিশোধমূলক আচরণ করেননি। কুরাইশদের অযৌক্তিক সব ধারা সত্ত্বেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি তাদের সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন। কারণ তারা লড়াইয়ের পরিবর্তে সন্ধির পথ চেয়েছিল। অষ্টম হিজরিতে চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে নবী (সা.) যখন মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন, তখন মক্কার উপকণ্ঠে কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। নবী (সা.) চাইলে তখনই তাকে হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। অথচ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বেই কুরাইশরা নবীজির বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।

মহানবী (সা.)-এর আগমনের আগেই দাসদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। তাদের মানুষ পর্যন্ত মনে করা হতো না। হেন কোনো অবিচার নেই, যা তাদের সঙ্গে করা হতো না। জীবনযাপনের ন্যূনতম অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হতো। তিনিই সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছেন, ‘তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তোমরা যা খাও, তাদের তা-ই খাওয়াবে। তোমরা যা পরিধান করো, তাদের তা-ই পরিধান করাবে। এমন কাজের দায়িত্বভার তাদের দিয়ো না, যা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। যদি দিতেই হয়, তবে তাদের সাহায্য করো।’ (বুখারি ও মুসলিম)

কোরআন-হাদিসের একাধিক জায়গায় দাসদের সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবী (সা.) কেবল সেটা আদেশ করেই ক্ষান্ত হননি, বাস্তবজীবনে সেটা প্রয়োগ করেও দেখিয়েছেন। নবীজির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত ওমর (রা) যখন জেরুসালেম সফরে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর একজন দাস। তাঁরা পালাক্রমে উঠের পিঠে আরোহণ করতেন। একজন উঠের পিঠে থাকলে অপরজন সেটা টেনে নিয়ে যেতেন। এভাবে যখন তাঁরা জেরুজালেমের কাছাকাছি পৌঁছালেন, তখন ছিল দাসের আরোহণ করার পালা।

হজরত ওমর নিঃসংকোচে গোলামকে উটের পিঠে আরোহণ করিয়ে নিজে টেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছেন।

মহানবী (সা)-এর ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মুসলিম-অমুসলিমের ভেদাভেদ ছিল না। নীতির বেলায় তিনি তাঁর অনুসারী কিংবা বিরোধীদের মধ্যে কোনো বাছবিচার করেননি। তিনিই উচ্চারণ করেছিলেন, ‘যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে ফেলতে দ্বিধা করতাম না।’ আশআস বিন কায়েস বলেন, একটি জমি নিয়ে আমার ও এক ইহুদির মধ্যে বিরোধ ছিল। আমি বিষয়টি নবীজির সামনে উত্থাপন করলাম। নবীজি বললেন, ‘তোমার কাছে কি তোমার দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ আছে?’ আমি না-সূচক উত্তর দিলাম। তিনি ইহুদিকে লক্ষ করে বললেন, ‘তুমি কি আল্লাহর নামে শপথ করে বলতে পারবে?’ সঙ্গে সঙ্গে আমি বলে উঠলাম, ‘শপথের সুযোগ পেলে তো সে শপথ করে সব নিয়ে নেবে।’ (বুখারি)

বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো, বাদীকে তার দাবির পক্ষে কমপক্ষে দুজন কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করতে হবে। সে যদি সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারে, তবে বিবাদী থেকে শপথ নেওয়া হবে। চিন্তা করে দেখুন, একজন ইহুদি (যারা কি না ইসলামের আজন্ম শত্রু) নবীজির সাহাবির সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ করছে। আর তিনি বিন্দুমাত্র নীতি থেকে সরলেন না।

উম্মতের প্রয়োজনে আল্লাহর হুকুমে মহানবী (সা.) ১১টি বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রীদের মধ্যে তিনি পূর্ণ সমতা বিধান রক্ষা করেছেন।

প্রত্যেকের জন্য পৃথক ঘর ছিল। সবার কাছেই তিনি সমানভাবে যেতেন। মৃত্যুর তিন দিন আগে পর্যন্ত তিনি এ বিধান রক্ষা করেছেন। নবীজির জন্য বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবুও তিনি এর অন্যথা করেননি। এক দিন তিনি এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করছিলেন। অন্য এক স্ত্রীর ঘর থেকে একজন লোককে দিয়ে একটি বাটিতে কিছু খাবার পাঠানো হলো নবীজির জন্য। ঘরে থাকা স্ত্রী লোকটির হাত থেকে বাটিটি নিয়ে ভেঙে ফেললেন। নবীজি হেসে বললেন, ‘তোমাদের মা রাগ করেছেন।’ এরপর তিনি সেই স্ত্রীর ঘর থেকে ভালো একটি বাটি নিয়ে অন্য স্ত্রীর ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। 

লেখক: শিক্ষক ও হাদিস গবেষক

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

গিবতের ভয়াবহ ৬ কুফল

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১২ জানুয়ারি ২০২৬

নফল ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত

প্রবাসীদের নিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিন্নধর্মী আয়োজন

তওবা: মুমিনের নবজাগরণের পথ

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১১ জানুয়ারি ২০২৬

পণ্য মজুতদারি ও সিন্ডিকেট: ইসলামের সতর্কবার্তা

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১০ জানুয়ারি ২০২৬

জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করলে যে সওয়াব