ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নানা বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল দুই ভাই-বোন। নতুন জামা, স্বজনদের সান্নিধ্য আর গ্রামবাংলার আনন্দঘন পরিবেশে কাটছিল তাদের সময়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আনন্দের বাড়ি পরিণত হলো শোকের জনপদে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় গর্তের পানিতে ডুবে প্রাণ গেল ১৫ বছরের রুশা মনি ও তার পাঁচ বছরের ছোট ভাই কাইফের। আজ বুধবার দুপুরে উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের মাজারেরপাড় এলাকায় এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর নগরীর শিরিনপার্ক এলাকার বাসিন্দা রাসেল ও আদুরী দম্পতির মেয়ে রুশা মনি ও ছেলে কাইফ গতকাল মঙ্গলবার মায়ের সঙ্গে গঙ্গাচড়ার কোলকোন্দ ইউনিয়নের মাজারেরপাড় এলাকায় নানা বাড়িতে বেড়াতে আসে।
নিহত শিশুদের নানা কাজী ইসলাম ও নানি ছকিনা বেগম জীবিকার তাগিদে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। ঈদুল আজহার ছুটিতে মেয়ের পরিবারকে নিয়ে ঈদ করার উদ্দেশ্যে তাঁরা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফেরেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন নাতি-নাতনি, মেয়ে আদুরী বেগম ও জামাইয়ের জন্য কেনা ঈদের নতুন কাপড়চোপড়।
স্বজনরা জানান, আজ দুপুরে মেয়ের জামাই রাসেল শ্বশুরবাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন। পরে রংপুর নগরীতে ফেরার কথা ছিল তাঁর। এর মধ্যেই বাড়ির পাশের একটি বাড়ির পেছনে খেলতে যায় রুশা মনি ও কাইফ। একপর্যায়ে বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকা একটি গর্তে পড়ে যায় ছোট্ট কাইফ। ছোট ভাইকে ডুবে যেতে দেখে তাঁকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দেয় বড় বোন রুশা মনি। কিন্তু সাঁতার না জানায় দুজনেই পানিতে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় এক শিশুর চিৎকারে বিষয়টি জানতে পারেন আশপাশের লোকজন। পরে দ্রুত দুই ভাই-বোনকে উদ্ধার করে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
নাতি-নাতনির মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে মেঝেতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নানি ছকিনা বেগম। বুকফাটা আর্তনাদ করে তিনি বলেন, ‘মোর সোনা দুইটার জন্যে মুই এত কষ্ট করি, এত কাপড়চোপড় কিনি আনুং। এই কাপড়চোপড় কায় নিবে?’
হাসপাতালে ছেলের নিথর দেহ কোলে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা রাসেল বলেন, ‘বাবারে, তোরা দুই ভাই-বোন মোক ছাড়ি কই গেলু? মুই এখন কাক নিয়ে থাকি? হে আল্লাহ, মুই তোর কাছে কি অপরাধ করছিনুং, কেন মোক এত বড় শাস্তি দিলি?’
প্রত্যক্ষদর্শী মারুফা আক্তার বলেন, আমার মেয়ে চিল্লাইতে চিল্লাইতে কইতেছিল—‘মা, কাইফ আর রুশা মনি পানির তলে গেছে।’ এই কথা শুনে আমি চিৎকার দিলে আরও কয়েকজন দৌড় দিয়া আসে। পরে বাচ্চা দুইটারে পানি থেকে তুইলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তার কইল, তারা আর বাঁচে নাই।
গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আনিচা বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে আনার পর শিশু দুটিকে আমরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করি। তাদের শরীরে জীবনের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।’