জীবনের ৫২টি বসন্ত পেরিয়ে এসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কালিগঞ্জ গ্রামের শেফালী বেগম। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, পারিবারিক দায়িত্ব ও জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। অভাবনীয় এই সাফল্যের পর তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য এখন উচ্চশিক্ষা অর্জন করা।
শেফালী বেগম জানিয়েছেন, তাঁর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিজের মনোবল, স্বামী ও সন্তানের উৎসাহ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মিশ্রণ।
মাত্র দেড় বছর বয়সে ফুফাতো ভাই মকছেদুল আলমের সঙ্গে বিয়ে হয় শেফালীর। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বামীর বাড়িতে আসার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সংসার, সন্তান ও দায়িত্বের মাঝে শিক্ষার স্বপ্ন কখনো ভেঙে যায়নি তাঁর।
সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১১ সালে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন। টানা দুই মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০২০ সালে স্বামী ও ছেলের উৎসাহে আবারও বই হাতে তুলে নেন শেফালী বেগম। ভর্তি হন ডোমার উপজেলার গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে। এরপর ২০২৩ সালে জিপিএ ৪ দশমিক ২৯ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। আর এবার এইচএসসিতেও সাফল্য পেলেন তিনি।
শেফালী বেগম বলেন, ‘সংসার সামলানোর পাশাপাশি পড়ালেখা করা কঠিন ছিল। তবে প্রতিদিনের পরিশ্রম ও ধৈর্যই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। সব কাজ শেষ করার পর রাত ৯টার পরে পড়তে বসতাম। কোনো প্রাইভেট শিক্ষক ছিলেন না, অনেক সময় ইংরেজি ছেলে-মেয়েদের কাছে শিখে নিয়েছি। কখন যে রাত ১টা–২টা বেজে যেত, টেরই পেতাম না।’
শেফালী আরও বলেন, ‘আমার খুব ইচ্ছা ছিল উচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার, কিন্তু পারিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন স্বামীর বাড়ি যেতে হয়। তারপর সংসার আর সন্তানদের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছি। তাঁদের সফলতা আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এই বয়সে এসে অনেকে পারবে কি না জানি না, কিন্তু আমি পেরেছি। বয়স শুধু একটা সংখ্যা মাত্র। আমি সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যাব, এবার অনার্সে ভর্তি হব।’
শেফালীর স্বামী মোকছেদুল আলম বলেন, ‘আমরা সব সময় পাশে থেকেছি। বলেছি, ভালো ফলাফল লাগবে না, পাস করে আসো। এতে সমাজের জন্যও কিছু করা সম্ভব। সংসারের দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করেছি, যাতে পড়াশোনা করতে পারে।’
শেফালীর বড় ছেলে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান সন্তানদের মধ্যে একজন যে তাঁর মায়ের সাফল্যে এত আনন্দিত। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশের মতো নয়।’