বর্ষার টানা বৃষ্টিতে বেড়েছে নদী, খাল, বিলের পানি। কোথাও কোথাও আবার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে ইতিমধ্যেই। তো, এলাকাবাসীর আর উপায় কি! চক্রযান ছেড়ে তাই পানিতে ভাসছেন তারা নৌকার ভরসায়। নতুন পানিতে মাছ ধরার কাজেও এসব নৌকার কদর আর চাহিদা বেড়েছে। নাটোরের গুরুদাসপুরসহ চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন আসবাবপত্রের কারখানায় এখন তাই কাঠের ডিঙি নৌকা তৈরির ধুম পড়েছে।
দখল, দূষণ, বিলের মাঝ দিয়ে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক নির্মাণ এবং বসতি গড়ে ওঠায় ঐতিহ্যবাহী চলনবিল সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবু বর্ষাকালে এখানে মাছ মেলে, মানুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিনোদনের খোঁজে আসে। দ্বীপের মতো জেগে থাকা গ্রামগুলোতে যাতায়াত, বিলের পানিতে ভেসে বেড়ানো এবং মাছ ধরার প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে ডিঙি নৌকা।
চাহিদা মেটাতে চলনবিলের নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর উপজেলার আসবাবপত্র তৈরির কারখানায় কাঠের ডিঙি নৌকা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে ডিঙি নৌকার বড় মোকাম হিসেবে পরিচিত নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা।
ভৌগোলিক কারণ ও কাঠের সহজলভ্যতার কারণে গুরুদাসপুর উপজেলায় কমপক্ষে ১৫টি কারখানা গড়ে উঠেছে। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার পৌরশহরের চাঁচকৈড়ে হাট বসে। আশপাশের উপজেলার মানুষের নৌকার চাহিদা মেটায় এখানকার কারখানাগুলো।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি কারখানাতেই কারিগররা নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত। শিমুল, মেহগনি, কাঁঠাল, আম, বটগাছ ও নিমগাছের কাঠ ব্যবহার হচ্ছে। কেউ সাইজ অনুযায়ী কাঠ কাটছেন, কেউ লোহা-পেরেক লাগাচ্ছেন, আবার কেউ নৌকার নিচে প্লেনসিট বসাচ্ছেন। কারিগরদের ব্যস্ততা আর হাতুড়ির শব্দে মুখরিত কারখানাপাড়া।
কারখানায় তৈরি নৌকাগুলো সড়কের পাশে সারি করে রাখা হচ্ছে। অনেকেই দেখে-শুনে দরদাম করে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আকার ও মানভেদে প্রতিটি ডিঙি নৌকা ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্লেনসিট দিয়ে তৈরি নৌকা বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকায়।
কারখানা মালিক শামীম, ইয়ারুল, জাহাঙ্গীর হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কাঠ, লোহা ও কারিগরদের মজুরির সঙ্গে অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়েছে। এ কারণে লাভ কম হচ্ছে। তবু ক্রেতার চাহিদা ধরে রেখেছি।’
কারিগর আফজল ও শরীফ বলেন, ‘বিগত বছর চলনবিলে পানি কম থাকায় নৌকার চাহিদা কম ছিল। এবছর উল্টোচিত্র। এ কারণে নৌকার চাহিদা বাড়ায় ব্যস্ততাও বেড়েছে। দিনে আমরা ২টি নৌকা তৈরি করতে পারি। নৌকা প্রতি ১ হাজার টাকা মজুরি পাই।’
তাড়াশ উপজেলার হামকুরিয়া গ্রামের আসাদ মাঝি ও চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল থেকে আসা দেদার ফকির জানান, খেতখামারে কাজ করে তাঁদের সংসার চলে। এখন হাতে কাজ নেই। তাই ডিঙি নৌকায় মাছ ধরে জীবিকা চালানোর জন্য তাঁরা নৌকা কিনতে এসেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, বর্ষার এ সময়টাতে শতশত মানুষ ডিঙি নৌকায় মাছ ধরে সংসার চালান।
গুরুদাসপুর উপজেলা ফার্নিচার পট্টির মালিক সমিতির সভাপতি শামীম বলেন, ‘এখানে ভালো কাঠ ও দক্ষ কারিগর দিয়ে ডিঙি নৌকা তৈরি করা হয়। এ হাটে নৌকা প্রতি খাজনা রাখা হয় ২০০ টাকা। এটা খুবই সীমিত। মালিক সমিতি হাটের দেখভাল করায় খাজনা নিয়ে কোনো রকম ঝামেলা সৃষ্টি হয় না।’