আফ্রিকা মহাদেশে প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, ‘যখন কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ মারা যান, তখন যেন একটি আস্ত লাইব্রেরি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।’ নাইজেরিয়ান চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মালিক আফেগবুয়ার কাছে এটি শুধু রূপক অর্থে নয়, এক রূঢ় বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না, আমার প্রপিতামহ দেখতে কেমন ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আমার কাছে কোনো তথ্যও নেই।’
এই শূন্যতা থেকে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আফ্রিকার ঐতিহ্যকে ‘অমর’ করে রাখতে চান এই নাইজেরিয়ান শিল্পী। আফ্রিকান ঐতিহ্যের তথ্য ও ইতিহাসের ঘাটতি পূরণে আফেগবুয়া শুরু করেছেন ‘লিগেসিলিঙ্ক’ নামের একটি ব্যতিক্রমী প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য শুধু মহাদেশের বয়োজ্যেষ্ঠদের জীবন ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করাই নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোকে চিরদিনের জন্য ‘অমর’ করে রাখা।
আফেগবুয়া বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের বয়োজ্যেষ্ঠদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তাঁদের জীবনের গল্প রেকর্ড করছেন, ভিডিও ধারণ করছেন এবং তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর থ্রিডি স্ক্যান করছেন। এসব তথ্য ব্যবহার করে তিনি ওই প্রবীণ ব্যক্তিদের ‘ডিজিটাল টুইন’ বা হুবহু ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করতে চান।
পরবর্তী সময়ে এগুলো বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে হলোগ্রাফিক ডিসপ্লে হিসেবে প্রদর্শন করা হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন। আর এই পুরো কথোপকথনকে জীবন্ত করে তুলবে এআই প্রযুক্তি।
আফেগবুয়া আরও জানান, চূড়ান্ত ডিসপ্লেটি এমন অনুভূতি দেবে, যেন ‘কোনো একজন মানুষ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি কথা বলছেন। ব্যবহারকারীরা এই ডিজিটাল প্রবীণদের তাঁদের জীবন ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারবেন এবং আফেগবুয়ার নেওয়া সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তর দেবে। প্রকল্পটি সর্বসাধারণের কাছে সহজলভ্য করতে তিনি একটি অনলাইন চ্যাটবট তৈরিরও পরিকল্পনা করছেন।
তবে প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আফেগবুয়া এরই মধ্যে নাইজেরিয়ায় ১৫ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং কেনিয়া, ক্যামেরুনসহ বিভিন্ন দেশে আরও ৩০টি সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। ২০২৮ সালের মধ্যে অন্তত এক হাজার প্রবীণ মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তিনি।
এই কাজের ক্ষেত্রে আফেগবুয়া কোনো এআই অনুবাদক ব্যবহার না করে মানুষের করা অনুবাদের ওপর নির্ভর করছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এআই অনেক ভাষা পুরোপুরি বুঝতে পারে না, কিংবা কিছু বিষয়ের ভেতরের সূক্ষ্ম অর্থ বা আবেগ ধরতে পারে না।’
শুরুর দিকে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি এ বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। নাইজেরিয়ার লাওস রাজ্যের ইকরোডুর একদল প্রবীণ আফেগবুয়াকে বলেছিলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এ ধরনের গল্প বা ইতিহাস অন্যদের জানাতে নিষেধ করেছিলেন। পরে আফেগবুয়া স্লাইড শোর মাধ্যমে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর তাঁরা বেশ উৎসাহী ও কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। তিনি এই প্রবীণ ব্যক্তিদের বিভিন্ন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন, কীভাবে এআই গল্প বলা এবং স্মৃতিচারণায় সাহায্য করতে পারে।
তবে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আফেগবুয়াকে বেশ সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়ে কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করেন, কেউ কেউ সরাসরিই মানা করে দেন। এই ট্রমা কিংবা মানসিক আঘাত এখনো তাঁদের মধ্যে বিরাজমান। সে কারণে আমরা কাউকে জোর করি না।’
আফেগবুয়া প্রথম ২০২৩ সালে তাঁর ‘দ্য এল্ডার্স সিরিজ’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। সেখানে তিনি এআই ব্যবহার করে প্রবীণ আফ্রিকানদের ফ্যাশন শোর ক্যাটওয়াকে উপস্থাপন করেছিলেন।
‘লিগেসিলিঙ্ক’ যেখানে জীবিত মানুষের জ্ঞান সংরক্ষণের কাজ করছে, সেখানে আফেগবুয়া ‘রি-মেমোরি’ নামের আরেকটি ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছেন। এর উদ্দেশ্য হলো হারিয়ে যাওয়া, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা বর্তমানে প্রবেশের অনুপযোগী প্রাচীন আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে এআইয়ের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করা। ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং একাডেমিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সাইটগুলোতে ব্যবহারকারীরা কম্পিউটার, মোবাইল ফোন বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেটের মাধ্যমে ভ্রমণ করতে পারবেন।
নাইজেরিয়ার কানুর ৫০০ বছরের পুরোনো ‘কোফার মাতা ডাই পিটস’ (কাপড়ে নীল রং করার ঐতিহ্যবাহী জায়গা) থেকে এই ধারণার জন্ম হয়।
ওই অঞ্চলে নিরাপত্তার অভাব থাকায় অনেকেই সেখানে যেতে চান না। তাই আফেগবুয়া এর একটি ভিআর ফিল্ম তৈরি করেন, যেন এই ঐতিহ্য কখনো হারিয়ে না যায়।
এই প্রকল্পের অধীনে তিনি প্রথমত ঐতিহাসিক বেনিন শহরের ১৮ মিটার উঁচু মাটির প্রাচীর ভার্চুয়াল পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন। এই প্রাচীর সাত থেকে চৌদ্দ শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তবে বর্তমানে এর বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
আফেগবুয়া আরও বলেন, ইতিহাসের পাতায় কিছু তথ্যের ঘাটতি থাকলেও তিনি যতটা সম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে ভাষা, প্রাচীন নিদর্শন এবং প্রতীকগুলো পুনরুদ্ধার করে সেসব নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর মূল লক্ষ্য।
সিএনএন থেকে অনূদিত