মাঠের লড়াইয়ে একজন অতন্দ্র প্রহরী, অন্যজনের চেষ্টা করেন দুর্ভেদ্য দেয়াল রূপে আবির্ভূত হওয়ার। একজন গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে নির্দেশনা দিচ্ছেন, অন্যজন প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দিতে লড়ছেন সামনে থেকে। কাকতালীয়ভাবে তাঁরা যমজ বোন।
ইন্দোনেশিয়ায় এশিয়ান গেমস নারী হকির বাছাই খেলতে আজ রাতে রওনা দেবে বাংলাদেশ। এবারই প্রথম নারী হকিতে জাতীয় দল সাজিয়েছে হকি ফেডারেশন। সেই আলোচনায় হিমাদ্রী বড়ুয়া সুখ ও নীলাদ্রী বড়ুয়া নীল। চেহারার মিল এতটাই যে খোদ কোচও তাঁদের আলাদা করতে হিমশিম খান। তবে মাঠে তাঁদের ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা।
হিমাদ্রী গোলরক্ষক আর নীলাদ্রী ডিফেন্ডার। হকিতে তাঁদের আসাটা ছিল অনেকটা হঠাৎ করেই। শুরুতে দুজনেই ক্রিকেট খেলতেন। কিন্তু উচ্চতার (৫ ফুট ৭ ইঞ্চি) কারণে নারী দলের কোচ জাহিদ হোসেন রাজু তাঁদের হকিতে উদ্বুদ্ধ করেন। হিমাদ্রীর চেয়ে বয়সে ২ মিনিটের ছোট নীলাদ্রী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে আমরা ক্রিকেট খেলতাম। যখন বিকেএসপিতে পরীক্ষা দিই, রাজু স্যার তখন আমাদের হাইট ভালো ছিল দেখে ফরম তুলে দিয়ে ভর্তি করান। ভর্তির পরেই আমরা হকি খেলি মূলত।’
বাবা বিজয় বড়ুয়া একজন ক্রীড়াপ্রেমী। মেয়েদের খেলাধুলার পথে বাধা হয়ে ওঠেননি কখনো। হিমাদ্রী তাই বলে ফেলেন, ‘নিজেদের ইচ্ছায় নয়, বাবার ইচ্ছাতেই একপ্রকার খেলায় এসেছি।’ ২০ বছর বয়সী দুই বোনের বোঝাপড়ার রসায়নটা দারুণ। হিমাদ্রী তাই ভাগ্যকে ধন্যবাদই দিলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে আছি। যেখানেই গিয়েছি, ভাগ্য আমাদের পাশে ছিল। আমরা কোথাও আলাদা যাইনি।’
গোলরক্ষক হিসেবে হিমাদ্রীকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়, আর তাঁকে অক্ষত রাখাই নীলাদ্রীর কাজ। তবে ছোটখাটো ভুল হলে হিমাদ্রী মাঠেই চিৎকার করেন। নীলাদ্রী হাসতে হাসতেই বলেন, ‘ও চিৎকার করে যখন রক্ষণের ভুলে গোল হজম করতে হয়। কেন ম্যান মার্কিং করলাম না, এগুলো বলে। ওভাবে ঝগড়া হয় না। ও যদি গোল হজম করে তখন অনেক চাপ হয়ে যায়। সব সময় গোল থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করি আমি।’
যমজ হওয়ার কারণে মজার ঘটনারও অভাব নেই। প্র্যাকটিস সেশন বাদে অন্যান্য ক্ষেত্রে কোচ থেকে শুরু করে সতীর্থরা প্রায়ই ভুল মানুষকে ডেকে বসেন। নীলাদ্রী সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা অনেক হয়েছে। আমাদের কোচ স্যার এখনো জানেন না, কে হিমাদ্রী আর কে নীলাদ্রী। উনি ডাকলে দুজনকেই ডাকেন বা দুজনকে দেখে হাসেন।’ তবে জার্সি নম্বর (১ এবং ১৬) তাঁদের আলাদা পরিচয় দেয়।
এশিয়ান গেমস বাছাই পর্বে চায়নিজ তাইপে, হংকং ও উজবেকিস্তানের বিপক্ষে লড়বে বাংলাদেশ। প্রথমবার এশিয়ান গেমসে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হিমাদ্রী, ‘অনেক ভালো লাগছে যে এশিয়ান গেমসের মতো বড় জায়গায় খেলার সুযোগ আছে আমাদের। আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে যেন আমরা কোয়ালিফাই করি।’ স্বপ্নবাজ নীলাদ্রি চোখ রাখছেন আরও দূরে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেন একটা অলিম্পিক খেলতে পারি আর ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে পারি। এটাই আমাদের স্বপ্ন।’
চট্টগ্রামের রাউজান থেকে স্বপ্নযাত্রা শুরু করা দুই বোন জাকার্তায় ইতিহাস গড়ার সাক্ষী হতে পারবেন কি না, তা সময় বলে দেবে।