১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেওয়া দলগুলোর র্যাঙ্কিং অনুযায়ী এই ধারাবাহিক উপস্থাপনায় আজ থাকছে আর্জেন্টিনা
লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই মহাকাব্যিক রাতের পর কেটে গেছে সাড়ে তিন বছর। কাতার বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্মৃতি এখনো আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের চোখে ভাসছে টাটকা রঙের ছবির মতো। কিন্তু ফুটবল সময়কে থামিয়ে রাখতে দেয় না। দেখতে দেখতে দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২৬ বিশ্বকাপ।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার যখন আর্জেন্টিনা মাঠে নামছে, তখন তাদের কাঁধে একই সঙ্গে মুকুট ধরে রাখার চাপ এবং সোনালি প্রজন্মের শেষ অধ্যায়কে অমর করে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। হোর্হে সাম্পাওলির বিদায়ের পর ২০১৮ সালে যখন লিওনেল স্কালোনি ভাঙাচোরা এক দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন হয়তো খোদ বুয়েনস এইরেসের কট্টর সমর্থকও ভাবেননি, এই শান্তশিষ্ট মানুষটি আর্জেন্টিনাকে এক অপরাজেয় পরিবারে রূপান্তর করবেন।
স্কালোনির আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ধারাবাহিকতায়। কাতার বিশ্বকাপের সেই বিশ্বজয়ী দলটির ১৭ জন এবারও বিশ্বকাপের বিমানে চেপেছেন। গত কয়েক বছরে কোপা আমেরিকার শিরোপা টানা জেতার পর লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে আধিপত্য ধরে রেখে তারা প্রমাণ করেছে, সাফল্য ক্ষুধার্ত মানসিকতাকে বিন্দুমাত্র সস্তা করে দেয়নি।
আর্জেন্টিনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। মাঝমাঠে আলেক্সিস মাক আলিস্তার ও এনসো ফার্নান্দেসরা এখন ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে। দলটির খেলার ধরনে দুটি রূপ স্পষ্ট—যখন মাঠে লিওনেল মেসি থাকেন, তখন পুরো খেলা আবর্তিত হয় তাঁকে কেন্দ্র করে। আর যখন তিনি থাকেন না, তখন দলটি হয়ে ওঠে আরও গতিশীল, সরাসরি ও ক্ষিপ্র। হুলিয়ান আলভারেসের মতো অক্লান্ত ফরোয়ার্ডরা মেসির হয়ে দৌড়ানোর কাজটি করার চেষ্টা করেন।
অবশ্য শুধু অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে বসে নেই আলবিসেলেস্তেরা। নাপোলির গিলিয়ানো সিমিওনে, স্ট্রাসবুর্গের বারকোদের মতো ফুটবলাররা সুযোগ পেয়েছেন দলে নতুন মাত্রা যোগ করতে। এর সঙ্গে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোতে আলো ছড়ানো ২১ বছর বয়সী মিডফিল্ডার নিকো পাসকে নিয়ে বাড়তি কৌতূহল রয়েছে।
রক্ষণ নিয়ে স্কালোনির কিছুটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে; কারণ, কাতার বিশ্বকাপের পর তেমন কোনো নতুন ডিফেন্ডার নিজেকে সেভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। ফলে ওতামেন্দি, রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেসদের মতো পুরোনোদের ওপরই ভরসা রাখতে হচ্ছে আলবিসেলেস্তেদের।
সব আলো, সব প্রার্থনা আর সব আবেগ ঘুরেফিরে স্থির হয়ে আছে সেই একটি নামেই—লিওনেল মেসি। নিজের ষষ্ঠ এবং ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে যখন তিনি মাঠে নামবেন, তখন টুর্নামেন্ট চলাকালীনই তাঁর বয়স ছুঁয়ে ফেলবে ৩৯-এর ঘর। সেই অতিমানবীয় গতি হয়তো এখন আর নেই, কিন্তু পেনাল্টি বক্সের চারপাশে তাঁর নিখুঁত দূরদর্শিতা আর জাদুকরি ফিনিশিং এখনো ফুটবল-বিশ্বের যেকোনো ডিফেন্সের জন্য সবচেয়ে বড় ত্রাস।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি নেই, জয়ের ক্ষুধায় মরচে পড়েনি—তাই এবার শুধু আরেকটি সোনালি অধ্যায় লেখার অপেক্ষা আর্জেন্টিনার জন্য। শিরোপা জেতার চেয়ে ধরে রাখার সেই কঠিন কাজই করতে হবে তাদের।
৪৭ বছর বয়সী লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার জয়ের হার প্রায় ৭০ শতাংশ। একটি বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা এনে দিয়েছেন। ২০১৮ সালে কেবল অন্তর্বর্তী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর স্কালোনি আজ তাঁর স্বদেশে এক অনন্য আইকন। দলের মধ্যে এমন এক প্রায় অভেদ্য সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, যা বড় বড় টুর্নামেন্টে তীব্র চাপের মুখে ভেঙে পড়া অতীতের আর্জেন্টিনা দলগুলোর একদম বিপরীত। মেসির সঙ্গে দলের বাকি খেলোয়াড়দের দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন।
নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না, লিওনেল মেসি এখনো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রধান মুখ। এই বিশ্বকাপের আগেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার গুঞ্জন উঠলেও বুটজোড়া তুলে রাখার আগে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের জন্য দারুণ অনুপ্রাণিত তিনি। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে শেষ করেছেন মেসি। এই পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে, জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর পথচলা এখনো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
র্যাঙ্কিং: ৩
ডাকনাম: আলবিসেলেস্তে
অঞ্চল: লাতিন আমেরিকা
অংশগ্রহণ: ১৯
সর্বোচ্চ সাফল্য: চ্যাম্পিয়ন (১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২)
বিশ্বকাপে
ম্যাচ ৮৮ জয় ৪৭ ড্র ১৭ হার ২৪
গ্রুপপর্বের সূচি
১৭ জুন আলজেরিয়া কানসাস সিটি সকাল ৭টা
২২ জুন অস্ট্রিয়া ডালাস রাত ১১টা
২৮ জুন জর্ডান ডালাস সকাল ৮টা