এইসাব এফসি’র খোঁজ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় জায়ান আহমেদের বাবা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শরীফ আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ফুটবল, বিশ্বকাপের মাঝে তিনি একদিন পরামর্শ দিলেন, এক ফাঁকে যেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট ফুটবল ক্লাবটা দেখে যাই।
বিশ্বকাপের হ্যাপা শেষ হলে এক স্নিগ্ধ বিকেলে নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনের প্যারেড গ্রাউন্ডে যাওয়া হলো এইসাব এফসির কার্যক্রম দেখতে। মাঠে স্বাগত জানালেন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ এস ইসলাম আরিফ। ব্রুকলিনের বিশাল মাঠটা যেন মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক কিংবা কিছুটা ঢাকার আবাহনী মাঠের মতো। যেখানে বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছে।
মোহাম্মদ এস ইসলাম আরিফের হাত ধরে ২০০৯ সালে ছোট্ট কলেবরে যাত্রা শুরু এইসাব এফসির। গত ১৭ বছরে ছোট পরিসরের প্রচেষ্টা থেকে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও আশপাশের অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন বয়সী বাংলাদেশি ফুটবলারদের নিয়ে এমন একটি সুসংগঠিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যেটির লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার ফুটবল অঙ্গনের সঙ্গে
বাংলাদেশি কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড প্রিমিয়ার সকার লিগের (ইউপিসিএলের) মতো উঁচু মানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্লাবটি একদিকে খেলোয়াড়দের জন্য পেশাদার পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে স্থানীয় কমিউনিটি টুর্নামেন্টগুলোর মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গেও দৃঢ় সংযোগ বজায় রাখছে।
এইসাব এফসি স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচালনায় বিনা খরচে বা স্বল্প ব্যয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। যাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো তরুণ বা খুদে প্রতিভাবান ফুটবলার খেলাধুলা থেকে দূরে সরে না যায় এবং ইতিবাচক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। উদ্যোগটি একই সঙ্গে দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করছে— তরুণদের নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে রাখতে তাঁদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং এমন প্রতিভা গড়ে তোলা, যাঁরা একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জায়ানের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। বলে রাখা ভালো, জায়ান ও তাঁর বাবার সঙ্গে খুব ভালো যোগ আছে নিউইয়র্কভিত্তিক এই ক্লাবের।
আজকের পত্রিকাকে আরিফ বললেন, ‘এখানে জায়ান খেলেছে। ওর বাবা শরীফ ভাই তো আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমাদের ক্লাবের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় বর্তমানে পেশাদার ফুটবলে জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্যে ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে আমরা স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের নিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ও লিগে অংশগ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছি। আমাদের সিনিয়র দলের অনেক খেলোয়াড়ই এক দশকের বেশি সময় ধরে এই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।’ আরিফ আরও যোগ করেন, ‘বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান ফুটবলারদের একটা প্ল্যাটফর্ম করে দেওয়ার চেষ্টা করি, যেন তারা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। সবাই তো আর বড় ফুটবলার হবে না। বাচ্চারা যেন ডিভাইস কিংবা যেকোনো নেতিবাচক কার্যক্রম থেকে নিজেদের দূরে রাখে, সেটাও একটা উদ্দেশ্য। যেন তাঁরা সুস্থ- সুন্দরভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে বেড়ে ওঠে।”
জায়ানের বাবা শরীফ এই ক্লাবের হয়ে খেলতে নিয়মিত পাঁচ ঘণ্টার সড়কপথে গাড়ি চালিয়ে আসেন ভার্জিনিয়া থেকে। ক্লাবটি নিয়ে তিনি বললেন, ‘আরিফ ভাইয়েরা ক্লাবটি নিয়ে দারুণ কাজ করে যাচ্ছেন। আমার অনেক দিনের বিরতি পড়েছিল। আমি ফুটবলে ফিরেছি তাঁদের আহ্বানেই।'
শুধু খেলোয়াড় তৈরির প্ল্যাটফর্মই নয়, ক্লাব থেকে রেফারি হিসেবেও গড়ে উঠছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে উঠে আসা অনেক প্রতিভাবান ফুটবলারের কথা জানা গেল আরিফের কাছ থেকে। এর মধ্যে একজন আতাউল আহমেদ। আতাউল স্বপ্নাতুর চোখে বললেন, “এক শর বেশি বাচ্চা আছে, সবাই এখানে অনুশীলন করে। আমি এখন সিনিয়র টিমের সঙ্গে আছি । অনেক বাঙালি পরিবার এখানে তাদের সন্তানকে পাঠাচ্ছে। স্বপ্ন দেখি, নিজেকে ভালোভাবে তৈরি করে জায়ান ভাইয়ের মতো একদিন বাংলাদেশ ন্যাশনাল টিমে খেলব।”