দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় ‘হ্যান্ড অব গডের’ ৪০ বছর পূর্তির দিনে ফুটবল বিধাতা ডালাসে আরও একটি মহাকাব্য লেখার প্রস্তুতি রেখেছিলেন। গ্যালারিজুড়ে তখন আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ‘মুচাচোস’ গানের সুর, আর হাজারো ভক্তের চোখে ইতিহাস ছোঁয়ার রোমাঞ্চ। সেই রোমাঞ্চ আর নাটকীয়তার ভেলায় চড়ে শেষ পর্যন্ত হাসল আলবিসেলেস্তেরা। লিওনেল মেসির রেকর্ড গড়া জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের টিকিট কেটে ফেলল লিওনেল স্কালোনির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের আগ্রাসী ফুটবলে মাঠের আবহ ছিল বেশ উত্তপ্ত। পঞ্চম মিনিটে নাউয়েল মলিনার পাস থেকে বল পেয়ে অস্ট্রিয়ার রক্ষণ ভেঙে দারুণ এক থ্রু-পাস বাড়িয়েছিলেন মেসি। বক্সে ছুটে যাওয়া লাউতারো মার্তিনেসকে ডিফেন্ডাররা ফাউল করলে ভিএআর দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে টপকে এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে স্পট-কিক নিতে আসেন মেসি। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে নবম মিনিটে তাঁর বাঁ পায়ের শটটি পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে চলে যায়।
গ্যালারিজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা, আর মেসির নামের পাশে যোগ হলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত হ্যাটট্রিক—বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে টানা তিন বিশ্বকাপে তিনটি পেনাল্টি মিস করলেন তিনি।
তবে মহাকাব্যের নায়কেরা তো আর ট্র্যাজেডিতে আটকে থাকেন না। ৩৮ মিনিটে মাঠের বুকে রচিত হলো চমৎকার এক দলীয় বোঝাপড়ার গল্প। মাঝমাঠ থেকে থিয়াগো আলমাদার পাস ধরে বাঁ প্রান্তে ওভারল্যাপ করা ফাকুন্দো মেদিনা বক্সে এক নিচু কাটব্যাক করেন। সেখানে ছুটে আসা থিয়াগো আলমাদা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্তভাবে বলটি নিজের পায়ের নিচ দিয়ে গলিয়ে দেন, যেন তিনি জানতেন পেছনেই ওত পেতে আছেন মেসি। ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে আর কোনো ভুল করেননি ফুটবল জাদুকর। বাঁ পায়ের চেনা জাদুকরী ছোঁয়ায় অস্ট্রিয়ার জাল কাঁপিয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি। ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৭ গোল নিয়ে মেসি তখন বিশ্বকাপের ইতিহাসের একক ও অনন্য চূড়ায়। সেই সঙ্গে তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করার ক্লাবে নাম ওঠালেন তিনি।
এক গোলে পিছিয়ে পড়ে বিরতির পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া। বিশেষ করে নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা মার্সেল সাবিৎসার ও কনরাড লাইমারের জুটিতে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ৫৫ মিনিটে সাবিৎসারের নেওয়া এক বিপজ্জনক ও বাঁকানো ফ্রি-কিক বাজপাখির মতো ডান দিকে ঝাঁপিয়ে দুই হাতে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনার ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান এমিলিয়ানো মার্তিনেস। এর পরপরই চোটের কারণে ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো মাঠ ছাড়লে অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দিকে রক্ষণভাগে নামান স্কালোনি। ম্যাচের শেষ দিকে অস্ট্রিয়ার ফিজিক্যাল ফুটবলের বিপরীতে আর্জেন্টিনা চেনা রক্ষণের দেয়াল তুলে ধরে। ৮২ মিনিটে মাক আলিস্তার ও দি পলকে তুলে পারেদেস ও তালিয়াফিকোকে নামিয়ে মাঝমাঠ আরও নিরেট করেন স্কালোনি।
ম্যাচ যখন ১-০ ব্যবধানে শেষের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই যোগ করা ৫ মিনিটের ইনজুরি টাইমে নাটকীয়তা রূপ নেয় চরমে। ৯৪ মিনিটে সাবিৎসারের ফ্রি-কিক থেকে কেভিন ডানসোর হেড ধরে পাত্রিক ভিমার প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন, কিন্তু তাঁর ফ্লিকটি অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে হাহাকার ওঠে অস্ট্রিয়া শিবিরে। ঠিক তার পরের মিনিটেই অস্ট্রিয়ার সেই স্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। বক্সের ভেতর প্রথমে হুলিয়ান আলভারেসের শট ও পরে মেসির প্রচেষ্টা প্রতিহত হয়। তবে ফিরতি বলে ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে জাদুকরী দক্ষতায় বল জালে জড়ান মেসি। ৯৫ মিনিটের এই দ্বিতীয় গোলের সঙ্গে সঙ্গো কেবল আর্জেন্টিনার ২-০ ব্যবধানের জয়ই নিশ্চিত হয়নি, মেসির বিশ্বকাপ গোল সংখ্যা গিয়ে ঠেকল ১৮-তে। টানা দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘জে’র শীর্ষস্থান এবং নকআউটের ‘রাউন্ড অব ৩২’ নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।