লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাতটি ফরাসি ফুটবলাররা হয়তো কখনোই ভুলতে পারবেন না। কিলিয়ান এমবাপ্পের অতিমানবীয় হ্যাটট্রিকের পরও টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার সেই ক্ষত এ এখনো রয়ে গেছে। তবে ফুটবলে হারের পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটাই সবচেয়ে সুন্দর। সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে এবং বিশ্বজয়ের নতুন মিশন নিয়ে আবারও উত্তর আমেরিকার বিমান ধরছে ফ্রান্স। ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট তারা কেটেছে রাজকীয় ভঙ্গিতেই।
এই বিশ্বকাপের পর ফ্রান্স ফুটবলের একটা সুন্দর সময় শেষ হতে চলেছে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে দলের কোচের দায়িত্বে থাকা দিদিয়ের দেশমের এটাই শেষ অ্যাসাইনমেন্ট। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি জেতা আর ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়—ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের বড় বড় সাফল্যে এই একটি নাম জড়িয়ে আছে। খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা মাত্র তিনজন মানুষের একজন তিনি। তাঁর সামনে এবার সুযোগ এক নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। প্রথম কোচ হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ৫৭ বছর বয়সী কোচ।
বাছাইপর্বের পথটা অবশ্য ফ্রান্সের জন্য খুব একটা মসৃণ ছিল না শুরুর দিকে। অক্টোবরে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে এক হতাশাজনক ড্রয়ের পর কিছুটা শঙ্কা জেগেছিল। তবে ফরাসিরা ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলতে জানে। নভেম্বরে প্যারিসের পার্ক দেস প্রিন্সেসে ইউক্রেনকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা নিশ্চিত করে বিশ্বকাপের মূল পর্ব। আর এই জয়ের নায়ক ছিলেন ফরাসি ফুটবলের বর্তমান রাজপুত্র কিলিয়ান এমবাপ্পে। পুরো বাছাইপর্বে অপরাজিত থাকা ফরাসিদের আক্রমণভাগ যেমন ১৬ গোল করে ছিল ধারালো, তেমনি রক্ষণভাগ মাত্র ৪ গোল হজম করে ছিল ইস্পাতকঠিন।
স্কোয়াডের গভীরতাই ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশমের প্রিয় ৪-২-৩-১ ফরমেশনে প্রতিটি পজিশনের জন্যই বিশ্বমানের একাধিক বিকল্প তৈরি। আক্রমণভাগে এমবাপ্পের পেছনে মাইকেল ওলিসে যেমন আলো ছড়াচ্ছেন, তেমনি দুই প্রান্তে খেলার জন্য আছেন ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী উসমান দেম্বেলে, ব্রাডলি বারকোলার মতো তারকারা। রক্ষণভাগ সাজাতে গিয়েও দেশমকে পড়তে হয় মধুর সমস্যায়। তা প্রমাণ করে, এই দলের বিকল্প শক্তির গভীরতা কতটা অতল।
আমেরিকার মাটিতে এবারের বিশ্বকাপ ফ্রান্সের জন্য পুরোনো এক স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৯৪ সালে আমেরিকার বিশ্বকাপে যাওয়ার খুব কাছে গিয়েও শেষ মুহূর্তের এক ভুলে বাদ পড়েছিল ফ্রান্সের নামিদামি দলটি। দীর্ঘ ৩২ বছর পর সেই আমেরিকার মাটিতেই আবার যাচ্ছে ফরাসিরা। তবে এবার তারা যাচ্ছে শিরোপার বড় দাবিদার হয়ে, র্যাঙ্কিংয়ের চূড়ায় থেকে। কোচের বিদায়ে ফ্রান্স কি পারবে নতুন কোনো ইতিহাস লিখতে?
কোচ দিদিয়ের দেশম
১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা আর ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে রাশিয়া জয়—ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের বড় বড় সাফল্যে দিদিয়ের দেশমের নাম জড়িয়ে আছে। আসন্ন বিশ্বকাপ শেষে তিনি যখন কোচের দায়িত্ব ছাড়বেন, ততদিনে এই পদে টানা ১৪ বছর পার করে দেবেন তিনি। মারিও জাগালো ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ারের পর খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে বিশ্বসেরা হওয়া এলিট ক্লাবের সদস্য তিনি।
তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে
ফ্রান্সের হয়ে ৫৬ গোল করা কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক ফর্ম দারুণ হলেও জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবসময় ভালো ছিল না। গত ইউরোতে নাক ভেঙে মাস্ক পরে খেলে মাত্র এক গোল করার পর ছয় মাস বাইরে ছিলেন। মার্চে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তিনি ফেরেন। মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা অরেলিয়েঁ চুয়ামেনি চোট ও নিষেধাজ্ঞার কারণে শেষ তিনটি ম্যাচ মিস করেন। গত দুই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করা এমবাপ্পে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন তো?
র্যাঙ্কিং ১
ডাকনাম: দ্য ব্লুজ
অঞ্চল: ইউরোপ
সেরা সাফল্য: চ্যাম্পিয়ন (১৯৯৮, ২০১৮)
অংশগ্রহণ: ১৭