হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পাহাড় কাটা ও সজলদের জীবন

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র 

পাহাড় কাটা হয় মূলত মাটি লুট করার জন্য। ছবি: আজকের পত্রিকা

মো. সাজ্জাদুজ্জামান সজলের কথা মনে আছে? ২০২৪ সালের কথা। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জের দোছড়ি বিটের বিট কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদুজ্জামান সজল। সদ্য বাবা হয়েছিলেন। উখিয়ার পাহাড় ধ্বংসকারী চক্র তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বলে সে সময় অভিযোগ করা হয়। সে সময় এই হত্যার প্রতিবাদে সভা-সমাবেশ হয়েছে রাঙামাটিতে। বক্তারা বলেছেন, পাহাড় কেটে মাটি ও বালি পাচারের সময় তা প্রতিহত করতে যাওয়ার কারণে সজলকে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হয়। সজল নেই। কিন্তু পাহাড় কাটার দুষ্ট চক্র আছে। সজল নেই। কিন্তু পাহাড় কাটা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, পাহাড় ও টিলা কাটা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রতিমন্ত্রী জানান, তিন মাসে আট পাহাড় বিলীনের সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে একে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে পরিবেশ অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, খাগড়াছড়িতে পাহাড় কাটার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড় কাটায় এক্সকেভেটর ব্যবহার বন্ধে নজরদারি বাড়াতে হবে। এক্সকেভেটর ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে দেখা যায় পাহাড় ধসের ঘটনা। পাহাড় ধসের কারণে বিলীন হয় অসংখ্য ঘর বাড়ি। ভারী বর্ষণ শুরু হলেই পাহাড় ধসের আতঙ্ক দেখা যায়। শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় না, অসংখ্য প্রাণহানিও ঘটে। এসবের পরও মানুষ একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য এখানে ঘরবাড়ি বানায়।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাহাড় কাটার খবর বেশি পাওয়া যায়। পাহাড় কাটা হয় মূলত মাটি লুট করার জন্য। এ ছাড়া সমতল ভূমি তৈরি করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়। পাহাড় কেটে প্লটও তৈরি করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ভবন। একটি তথ্য মতে, গত ২০ বছরে চট্টগ্রামে ২ হাজার একরের বেশি পাহাড় কাটা হয়েছে। রাঙামাটি শহরের ৩২ স্পটে পাহাড়ের ঢালে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছে হাজার হাজার মানুষ। কক্সবাজারের মোট বনভূমির ৭৩ হাজার ৩৫৮ হেক্টর বনভূমি লাখ লাখ মানুষের দখলে। এদের অধিকাংশ মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে। পাহাড় ধসে ৪ দশকে মারা গেছেন ৬ শতাধিক মানুষ। ২০০৭ সালে হাটহাজারি, পাহাড়তলী, বায়েজিদ বোস্তামি, খুলশীতে ১২৭ জন মানুষ মাটি চাপায় মারা যান। ২০১০ সালে হিমছড়ির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে মারা যান ৬২ জন। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রামুতে মারা যান ৩০ জন মানুষ। বিগত এক যুগে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে তিন শর বেশি মানুষ মারা গেছে। চট্টগ্রাম মহানগর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২০০৮ সালে পাহাড় ধসে ১৩ জন মারা যান। ২০০৯ সালে মারা যান ৫ জন, ২০১১-২০১৩ সালে ১৯ জন, ২০১২ সালে ২৯ জন, ২০১৫ সালে ৫ জন মারা যান কক্সবাজারে।

পাহাড় কাটা, পাহাড়ের গায়ে বসতি নির্মাণ, দালান-কোঠা নির্মাণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধি ১৯৯৫-এর ১৫ ধারা মতে এসব আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! পাহাড় কাটার ফলে মাটির অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায়। পাহাড়ের ওপর যে উদ্ভিদ প্রজাতি, তার অধিকাংশ হারিয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য। পাহাড় কাটার ফলে শুধু পাহাড় ধসই হয় না, এর ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমি ক্ষয়ের ঘটনা ঘটে। পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে পাহাড়গুলো দখল মুক্ত করতে হবে। ন্যাড়া পাহাড়ের ওপর গাছ লাগাতে হবে। কোনোভাবেই যেন কেউ সেসব জায়গায় বসতি গড়তে না পারে সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাস্তুহারা মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আগে করতে হবে।

এনভায়রনমেন্ট পিপল নামের একটি সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় প্রায় ১১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ছোট বড় ৫১টি সরকারি পাহাড় কাটা হয়েছে। এতে ঘরবাড়ি বানানো হয়েছে ৬৬ হাজারের বেশি। এসব বাড়ির কোনোটি এক থেকে তিন তলা। এসবের সংখ্যা হবে ২ হাজার। আধা পাকা টিনের বাড়ি রয়েছে প্রায় ৮ হাজার। বাকি ঘরগুলো কোনোটি বাঁশের বেড়া দিয়ে বানানো। কোনোটি টিন আবার কিছু বাড়িঘর ত্রিপলে ছাউনি দিয়ে গড়া। সংস্থাটির মতে, অবৈধভাবে তৈরি এ সমস্ত বাড়ির ৯০ ভাগ জমিই বন বিভাগের। এ সমস্ত বাড়ির মধ্যে ৬ হাজার ৮ শ বাড়ি অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে প্রায় ২৬ হাজার মানুষ বসবাস করে।

এই অবস্থায় প্রশাসনের পাহাড় কাটা বন্ধে জিরো টলারেন্স ভূমিকা নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি শিল্প প্রতিষ্ঠান নাহার এগ্রো লিমিটেডের নতুন কারখানা নির্মাণের জন্য সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পাহাড় কেটে জমি ভরাট ও সমতল করার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। নির্ধারিত তারিখে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। এটি প্রশাসনের অত্যন্ত সাহসী ও ভালো উদ্যোগ। পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের এই ধরনের উদ্যোগই পাহাড় ও টিলাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। তা না হলে পাহাড়ের মৃত্যুর সঙ্গে বাড়বে মানুষের মৃত্যুও।

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র 
পরিবেশ বিষয়ক লেখক

তেলাপোকার উত্থান ও তারুণ্যের ক্ষোভ

টিকার ট্রায়াল ও আফ্রিকার বিপন্ন শৈশব

এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল

সহজ সমাধান তবু উপেক্ষিতই থাকবে

তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে

বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কখনোই সুদৃঢ় নয়: উম্মে ওয়ারা

এটা আমাদের পৃথিবী, রক্ষার দায়িত্বও আমাদের

বিড়ম্বনাময় এবারের ঈদযাত্রা

সংস্কৃতি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি

উষ্ণ পৃথিবীর শীতল সতর্কতা