হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

তাজমিনের হত্যা নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

প্রতীকী ছবি

একজন কিশোরীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে পারিবারিক সম্পর্কের সংকট, কৈশোরের মানসিক জটিলতা, সামাজিক উদাসীনতার ব্যাপারগুলো। একজন কিশোরীকে হত্যা করা কেবল একটি পরিবারের সন্তান হারানোর ব্যাপার না, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাহীনতারও প্রশ্ন।

৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানখেতের আইল থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয়। এ ধরনের ঘটনার আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণের ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া।

যেকোনো শিশুর জন্য প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক মা-বাবা। পরিবার থেকেই শিশুর ভালোবাসা, বিশ্বাস, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও নিরাপত্তার শিক্ষা পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। সন্তান কী খাচ্ছে, কী পড়ছে, কিংবা পরীক্ষায় কত নম্বর পাচ্ছে—এসব বিষয়ে তাঁরা যতটা সচেতন, এর বাইরে সন্তানের মনের অবস্থা বোঝার প্রয়োজন তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তাজমিনকে হত্যার ঘটনায় অন্যতম প্রশ্ন হলো, একটি কিশোরী দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের নজরের বাইরে থাকলে অভিভাবকেরা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল কি না, পুলিশকে কখন জানানো হয়েছিল এবং অনুসন্ধানের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর প্রয়োজন।

কৈশোর মানুষের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে আবেগ, কৌতূহল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং বিপদের মুখোমুখি হওয়ার পর করণীয় সম্পর্কে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে না এ বয়সে। এ কারণে এই সময়ের বিপদগুলো সম্পর্কে পরিবার ও স্কুল থেকে পাঠ দেওয়া জরুরি।

অনেক মা-বাবা মনে করেন, কঠোর শাসনের মাধ্যমেই সন্তানকে সঠিক পথে রাখা সম্ভব। অথচ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া কখনো কখনো তার মধ্যে গোপনীয়তা ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। আবার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতাও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজন ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়। সন্তান যেন বুঝতে পারে, ভুল করলেও তার ফিরে আসার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মা-বাবাই।

আলোচিত ঘটনায় একটি স্বল্প সময়ের প্রেমের সম্পর্ক, হোটেলে অবস্থান এবং পরবর্তী যাতায়াতের যে বিবরণ সামনে এসেছে, সেগুলো সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হোটেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক অতিথির পরিচয় যাচাই করা হয়েছিল কি না, প্রচলিত নিবন্ধন ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং কোনো প্রতারণার ঘটনা ঘটেছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, কৈশোরের আবেগ বা ভুল সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই একটি শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধকে বৈধতা দেয় না। অপরাধের দায় অপরাধীরই। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রাপ্তবয়স্কদের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অভিযুক্ত সিএনজিচালকের অতীত আচরণ, মাদকাসক্তির অভিযোগ এবং স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। মাদকাসক্তি কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে হয়রানি, সহিংসতা বা অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে তা উপেক্ষা করা সমাজের দায়িত্বহীনতার পরিচয়। আমরা অনেক সময় বিপথগামী মানুষকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিই। অথচ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন কিংবা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সচেতন হই না। একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিবাদ করা নয়, অপরাধের ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ধরনের ঘটনায় অনেকে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এককভাবে দায়ী করছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনোভাবেই সঠিক না। প্রযুক্তির খারাপ দিক বাদ দিয়ে এর ভালো দিকগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাঠ শিক্ষকদের দিতে হবে। আবার অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখার পরিবর্তে বয়সোপযোগী ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া। তবে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, অনলাইন প্রতারণা এবং গোপন সাক্ষাতের ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। মা-বাবাকে সন্তানের ডিজিটাল জীবনের অংশ হতে হবে, গোপনে নজরদারি করে নয়, বিশ্বাস ও বয়সোপযোগী তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে। বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনিকাঠামো। কিন্তু আইন থাকার পাশাপাশি তার কার্যকর প্রয়োগ অপরিহার্য।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সেবার মাধ্যমে শিশু নির্যাতন, পাচার, বাল্যবিবাহ, মানসিক সংকট ও বিপদাপন্ন শিশুদের বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হয়। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় সেবা ৯৯৯ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত সহায়তার জন্য ১০৯ নম্বরও রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের কতজন কিশোর-কিশোরী এসব সেবা সম্পর্কে জানে? বিদ্যালয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিং, নিরাপদ ইন্টারনেট শিক্ষা এবং বিপদে পড়লে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবহন খাত, আবাসিক হোটেল এবং জনসমাগমস্থলে শিশু সুরক্ষার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে।

সন্তানের নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্ব অপরিসীম। তবে অভিভাবকত্বে ব্যর্থতা এবং ফৌজদারি অপরাধ এক বিষয় নয়। কোনো অভিভাবকের বিরুদ্ধে অবহেলা বা অপরাধে সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বরং এই ঘটনা আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা কি সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিই? তার বন্ধুদের চিনি? তার মানসিক পরিবর্তন বুঝতে চেষ্টা করি? সন্তান কি আমাদের কাছে ভয় ছাড়া সত্য কথা বলতে পারে? সন্তানকে অন্তত জীবনের প্রথম দুই দশক নিবিড় ভালোবাসা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং দায়িত্বশীল সহযোগিতার মধ্যে রাখতে হবে। তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে, তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও শেখাতে হবে।

তাজমিনের হত্যা যেন কেবল কয়েক দিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করে সাজা নিশ্চিত করা হোক। আর কোনো তাজমিনের স্বপ্ন যেন এভাবে থেমে না যায়—এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

সংস্কৃতির সংকট, জাতীয় স্বার্থ ও বন্দর রক্ষা

কৃষণ চন্দর, ঘৃণা ও দুধকলা দিয়ে পোষা কালসাপ

মানসম্মত হাসপাতালের জন্য প্রয়োজন দক্ষ নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী

শহরের বাইরেই হোক সচিবালয়

চেতনা: বিজ্ঞান ও দর্শনের নতুন সংশয়

সুখে থাকতে আসলে কী লাগে

বৈষম্য, বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের অবদান

মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধিতে নীতির টানাপোড়েন

শিশুর শীতের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি

সরকারি হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্র যায় কোথায়