হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাজেট হোক পরিবর্তনের দলিল

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

প্রতীকী ছবি

জাতীয় বাজেটকে ঘিরে প্রতিবছরই ব্যাপক আলোচনা হয়। প্রত্যাশা থাকে, বিতর্কও কম হয় না। কিন্তু বাজেট পাস হওয়ার কিছুদিন পর সেই আলোচনা স্তিমিত হয়ে যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাজেট কি শুধু একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি সত্যিই অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার কার্যকর হাতিয়ার?

আমরা সাধারণত বাজেটকে আয়-ব্যয়ের হিসাবের দলিল হিসেবে দেখি। অথচ একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট নীতিপত্র। কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, কোথায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দরিদ্র জনগোষ্ঠী কীভাবে সুরক্ষা পাবে এবং বিনিয়োগের বাধা কীভাবে দূর হবে, তার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। কিন্তু বাস্তবায়নের কার্যকর কাঠামোর অভাবে বাজেট অনেক সময় পরিবর্তনের রূপরেখা না হয়ে শুধু ঘোষণার নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে।

বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়? ফলাফল নিয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। কোন মন্ত্রণালয় কত টাকা পেল সেটা জানা যায়, কিন্তু সেই টাকায় কতজনের চাকরি হলো, কত শিশু পুষ্টি পেল, কত রোগী চিকিৎসা পেল, সেই হিসাব প্রায় কখনো সামনে আসে না। এই ফলাফলভিত্তিক কাঠামো না থাকলে বরাদ্দ বাড়লেও অবস্থার বড় পরিবর্তন হয় না। বরাদ্দ আর ব্যয়ের মধ্যে যে ফাঁক থাকে, সেটা প্রতিবছরই দেখা যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির একটি বড় অংশ অব্যয়িত থাকে, নয়তো বছরের শেষে তাড়াহুড়ো করে খরচ দেখানো হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে বাজেটের আকার বাড়িয়ে লাভ নেই।

রাজস্ব সংকট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বহু বছর ধরেই ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ­­সীমাবদ্ধ রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রায় এর দ্বিগুণ। এত সীমিত রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত একসঙ্গে সামাল দেওয়া কঠিন। কর বাড়ানো মানেই সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা নয়। মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত কর ফাঁকি কমানো, কর অব্যাহতির সুযোগগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং সম্পদশালীদের কার্যকরভাবে করের আওতায় আনা। একই সঙ্গে ব্যবসার জন্য করব্যবস্থা স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করা; তা না হলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে আগ্রহ হারান।

জ্বালানিনিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা এখনো আমদানিনির্ভরতার চক্রে আটকে আছি। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে, ভর্তুকির চাপ বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। এটা শুধু বিদ্যুতের সমস্যা নয়, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা। অথচ বাংলাদেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা অব্যবহৃত থাকছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি। রুফটপ সোলার, সেচে সৌরশক্তির ব্যবহার এবং শিল্পাঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাজেটে সামঞ্জস্যপূর্ণ বরাদ্দ এখনো নেই। সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য স্পষ্ট নীতিকাঠামো তৈরি করা এখন জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতার দিকেও নজর দিতে হবে। শিল্প খাতে এনার্জি অডিট, কম সুদের সবুজ ঋণ এবং প্রযুক্তি আপগ্রেডের প্রণোদনা দিলে আমদানির চাপও কমবে।

ব্যাংক খাতের সংকট এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। আনুষ্ঠানিক হিসাবেই খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যদিও প্রকৃত চিত্র আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বারবার পুনঃ তফসিলের সুযোগ ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিলেও সৎ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থার পূর্ণ প্রতিফলনও দেখা যায় না। তাই স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য কার্যকর পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে হবে, তবে অসৎ ঋণগ্রহীতা বা দুর্বল মালিকদের নয়।

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে পর্ষদ মালিকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং পরিচালকদের যোগ্যতা ও স্বার্থের সংঘাত বিষয়ে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আমাদের কথা ও কাজের মধ্যে এখনো বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেও মৌলিক ভাষা ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। একইভাবে বিদেশগামী শ্রমিকদের বড় অংশ কম দক্ষতার কাজে নিয়োজিত থাকায় তাদের আয় ও সুযোগ সীমিত থাকে। এ অবস্থার পরিবর্তনে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষার কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতেও বাজেটে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতে একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরা দরকার। রাজশাহীতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কী অবস্থা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি, যন্ত্রপাতি নষ্ট পড়ে আছে, ওষুধের সরবরাহ অনিয়মিত। একজন রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। সেই যাওয়া-আসার খরচে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার টালমাটাল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখনো ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে আসে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা তাই শুধু মানবিক দায় নয়, অর্থনৈতিক বিবেচনাও।

কর্মসংস্থানের সমস্যাটা কি বাজেট দিয়ে সমাধান সম্ভব? পুরোপুরি নয়, তবে বড় একটা অংশ নির্ভর করে সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছে, কিন্তু অর্থনীতি তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানের কাজ তৈরি করতে পারছে না। তৈরি পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু একটি খাতের ওপর নির্ভর করে এত বড় শ্রমশক্তি সামলানো যাবে না। অ্যাগ্রো প্রসেসিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি-সেবা, লজিস্টিকস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ টানতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাজেটে কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা রাখা যেতে পারে, অর্থাৎ নতুন কর্মী নিয়োগ করলে কর সুবিধা বা আংশিক মজুরি সহায়তার ব্যবস্থা।

আমার মতে, বিনিয়োগ পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামো নয়, নীতির অনিশ্চয়তা। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, নিয়মটা কী এবং সেটা কাল বদলাবে কি না। ঘন ঘন কর নীতির পরিবর্তন, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং মুনাফা ফেরত পাঠানোর জটিলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে, কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আলাদা থাকলে সেটা নামেই থাকে। কাস্টমস, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, সবকিছু ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ না করলে বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা বদলাবে না।

নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হতে যাচ্ছে আসন্ন এই বাজেট। তাই এখানে শুধু সংখ্যার পরিমাণ বাড়ালেই চলবে না, প্রয়োজন একটি স্পষ্ট ও শক্ত বার্তা। সেই বার্তাটি হওয়া উচিত, এবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে ফলাফলের ভিত্তিতে। কোন খাতে কত বরাদ্দ দেওয়া হলো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থে বাস্তবে কী পরিবর্তন এল, সেটাই জানতে চায় সাধারণ মানুষ। মানুষ আসলে বড় বাজেট দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাজেটের টাকায় তাদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারলেই বাজেটের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

পরিকল্পনা কঠিন, বাস্তবায়ন আরও কঠিন

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে জনকল্যাণের রাজনীতি

সুবিধাবঞ্চিতদের পুষ্টির উৎসব হোক কোরবানি

বদলে যাওয়া কোরবানির অর্থনীতির গল্প

দঙ্গলবাজির ব্যাক ফায়ার না ফ্রেন্ডলি ফায়ার

প্রবাসের দেশপ্রেম, বন্যার সিডনি জয়

যে তিন বিষয় কৃষকবান্ধব বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত

হামের কারণে এত শিশুর মৃত্যু পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড

সর্বক্ষেত্রে জাগরণ দরকার

এভাবে কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে