হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

এসএসসি ও সমমানের ফল: অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কসংকেত

মাছুম বিল্লাহ

পরীক্ষার খাতা ঠিকমতো পরীক্ষণ করলে নিতান্ত কমসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করে। ছবি: আজকের পত্রিকা

নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ পরে প্রকাশিত হলো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। বিলম্ব হচ্ছে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম অন্য কোনো ঘটনা আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করলে পাসের হার ২০ শতাংশের ওপরে-নিচে থাকত। কিন্তু পাসের হার ছিল প্রায় শতভাগ! শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সবাই এক গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। তবে এর বিরুদ্ধে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে জাতি একসময় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যেত। সে জায়গায় একটা বিরতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে।

এবার সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ অর্থাৎ পাসের হার ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ পরীক্ষার্থী, যা গতবার ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি ফেল এবং ৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি। ৬৯৯ প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। গত বছরের তুলনায় সার্বিক পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা সর্বনিম্ন।

৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় এ বছর পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ, তারাই একদিন দেশের সব দায়দায়িত্ব গ্রহণ করবে, হাল ধরবে। কাজেই তাদের সেভাবেই প্রস্তুত করতে হবে। যেনতেন পাস আর না পড়িয়ে শুধু গ্রেড দিয়ে বরং তাদের ক্ষতি করা হচ্ছিল। সেই অবস্থা থেকে বের হওয়া মাত্র শুরু হলো।

২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ওই বছর পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটিই কমেছিল, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। করোনা মহামারির মধ্যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়া ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

এভাবে প্রতিবছর পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর জন্য সঠিক কোনো কারণ ও ব্যাখ্যা শিক্ষা বোর্ডগুলো কিংবা শিক্ষা বিভাগ দেয়নি। তবে তাদের কিছু তৈরি করা উত্তর অর্থাৎ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবের জন্য তৈরি করা কিংবা হঠাৎ করে বলার প্রবণতা আমরা প্রতিবছরই দেখেছি। আসলে এসব নিয়ে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাস, পড়াশোনার ধরন কিংবা সমস্যাবলি সম্পর্কে তেমন গভীর ধারণা নেই। সাংবাদিকেরা তাঁদের দিকেই ক্যামেরা তাক করে রাখতেন মূল্যবান কিছু শোনার জন্য। কিন্তু তাঁরা অনুমানভিত্তিক, শুধু সংবাদপত্রের রিপোর্ট এবং চারদিকের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে কিছু মন্তব্য করতেন, যা বাস্তবের এবং মূল কারণের সঙ্গে অনেকটাই বেমানান। অথচ বোর্ডের একেক বছর একেক ধরনের ফল, এক বোর্ড থেকে অন্য বোর্ডে ফলের বিশাল পার্থক্য, শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও জ্ঞানে কতটা তফাত হচ্ছে, কেন হচ্ছে, এর বাস্তবসম্মত সমাধান কী কী হতে পারে—এগুলো অধরাই থেকে যেত।

শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। তবে শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মূলত বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। এ অবস্থা সরকার হঠাৎ করে বন্ধ করে দিতে পারবে না। দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রায় অর্ধেকে প্রধান শিক্ষক নেই, এই সমস্যা বছরের পর বছর লেগে আছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। আর বেসরকারির অবস্থা কী, সে তো আমরা সবাই জানি। দেশের ৫৫ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে একদিকে যেমন বিদ্যালয়গুলো নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেক বিষয়েই শিখন-ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

কয়েক বছর ধরে ‘দয়ার পাস’, ‘খয়রাতির পাসের’ ওপর চলছিল মূল্যবান শিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থা। টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে পরীক্ষার ফল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রকাশের অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষক হিসেবে এবং বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে দেখেছি পরীক্ষার খাতা ঠিকমতো পরীক্ষণ করলে নিতান্ত কমসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করে। অথচ সেটিকে বাড়িয়ে পাসের হার শতভাগে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হতো। ফলে শিক্ষার মান প্রায় শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। এ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে হবে।

তাই কোনো একটি জায়গা থেকে শুরু করা দরকার ছিল। এবং সেই শুরু অন্তত মাধ্যমিকের ফল দিয়ে শুরু হলো বলা যায়। এই ফল দেখে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার টেবিলে বসবে, অভিভাবক যাঁরা চান তাঁদের ছেলেমেয়েরা কিছু জানুক আর না জানুক জিপিএ-৫ তাদের পেতেই হবে, তাঁদের জন্যও কিছুটা সতর্কসংকেত এই ফল।

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ

বন্যা ও পাহাড়ধস: মৃত্যু ঠেকানোই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

তারুণ্যের শক্তিতে সমৃদ্ধ হোক কৃষি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ‘দুধভাত’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা

হাতি-মানব দ্বন্দ্ব ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দায়িত্ব

স্থিতিশীলতা ফেরাতে জাতীয় ঐক্য দরকার

প্রিয় ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হবে

বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের অপার সম্ভাবনা

সরলতার মহিমা ও সমাজের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা

পুতিন কি মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন

জর্ডানপ্রবাসীদের কষ্টের কথা কেউ জানে না