হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

‘ন’-এর ব্যবধান

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রতীকী ছবি

সেই যে মেয়ে, নাটোরের বনলতা সেন, তার উদ্দেশে জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’ তাঁর সে-বলার দ্বিধা থরথর বৃন্তে কেঁপেছিল জানি অত্যন্ত গভীর আগ্রহ ও ব্যাকুলতা; কিন্তু জানা তো ছিল না—আমার নয়, হয়তো অনেকের নয়—ওই বলার মধ্যে একটি নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যান রয়ে গেছে। কবি-সমালোচক জগন্নাথ চক্রবর্তী জানিয়েছেন এই সত্য তাঁর একটি গবেষণা নিবন্ধে। তাঁর যুক্তি অকাট্য। প্রথম প্রমাণ ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন’ কথাটার অর্থ কী? অর্থ এই যে বিলম্ব হয়ে গেছে। লেখাটা পড়ে আমি নীরবে মাথা দোলাই। তাই তো, ওটা তো খেয়াল করিনি। প্রেমিকার হয়তো এত দিনে বিয়েথা হয়ে গেছে, হতে পারে বাচ্চাকাচ্চাও এসেছে, ঈশ্বরের কৃপায়। এখন তিনি কী করে গ্রহণ করবেন তাঁর প্রেমিককে? এত দিন কোথায় ছিলেন?

দ্বিতীয় প্রমাণটা আরও শক্তিশালী। আপনি বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। ‘কোথায় ছিলেন?’ অর্থাৎ সম্পর্কটা এখন আর আগের মতো অন্তরঙ্গ নেই, আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়েছে। ‘আপনি’তে পরিণত হয়েছে। তাই তো, এ-ও তো ঢোকেনি আমার মাথায়। ওই যে সামান্য দন্ত্য ‘ন’—যাতে ‘ছিলে’ হয়ে যায় ‘ছিলেন’—সে তো সামান্য ব্যাপার নয়; এ তো অনেক কথা বলা; অনেক দূরত্বের, অলঙ্ঘনীয় ব্যবধানের স্মারক সে, যতই নিরীহ-মুখো হোক দেখতে। এরপরে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে কবি কেন বলছেন, ‘থাকে শুধু অন্ধকার’, ইত্যাদি। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের জন্য অন্ধকারই তো থাকবে, অন্য আর কী থাকা সম্ভব?

বুঝলাম। মাথা নেড়ে নেড়ে বুঝলাম। কিন্তু বেশ পরে—দ্বিতীয় চিন্তা এসেছে আমার। আচ্ছা, এমন যদি হতো যে বনলতা সেন খুব জোরেশোরে বলছেন, ‘এতোদিন কোথায় ছিলে?’ তাহলে কি এর চেয়ে বেশি অন্তরঙ্গতা বোঝাত? অথবা যদি তাঁরা প্রেমিক ও প্রেমিকা পরস্পরকে তুইতোকারি করতেন, তাহলেই কি নিশ্চিন্ত হতে পারতাম যে তাঁরা খুব কাছাকাছি হয়ে গেছেন পরস্পরের? বোধ হয় না, তুইতোকারির পক্ষে ঝগড়ার ভাষা হওয়া বিচিত্র নয়, যেমন বিচিত্র নয় ‘আপনি’ বলার পক্ষে অন্তরঙ্গতার পরিচায়ক হওয়া। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক ‘আপনি’ বললে, ‘ন’ ব্যবহার করলে, একটা দূরত্ব বোঝায়।

ভাগ্যিস, এই ‘ন’-এর ব্যাপারটা ছিল। নইলে আমাদের অনেক গবেষণাই মার খেত। কিন্তু শুধু গবেষণারই কষ্ট হবে কেন, গবেষণা তো সামান্য ব্যাপার, কষ্ট হতো আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোরও। একেবারে অচল হয়েই পড়ত, অনেক ক্ষেত্রে। সব সমান হয়ে গেলে কি সমাজ চলে?

অন্তত আমরা তা বিশ্বাস করি না। আমরা জানি, ভারি প্রয়োজন আছে এই ওপর-নিচের। আমি যদি আমার ওপরওয়ালাকে ‘স্যার’ না বলি, দেখা হওয়ামাত্র চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে না উঠি, তাহলে ওপরওয়ালাই-বা ওপরওয়ালা থাকেন কী করে, আর আমিই তাঁর নিম্নবর্তী হই কোন উপায়ে? দরকার, খুবই দরকার ওই দন্ত্য ‘ন’-দের।

আমার যে বন্ধু চীন ঘুরে এসেছেন সদ্য, তিনি বলছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। যখন বিদায় নিচ্ছেন, প্লেনে চাপবেন, তখন চীনের ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আবার কবে দেখা হবে? আমার বন্ধু বললেন, যেমন আমরা সচরাচর বলি, ওপরওয়ালার ইচ্ছা। চীনা ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে, বেশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে শেষে বললেন, ‘ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই তো।’ বলে আবার হাসলেন। সেই হাসি দেখে ভীষণ সন্দেহে পড়েছেন আমার বন্ধু। ওপরওয়ালা বলতে তিনি তো বোঝাতে চেয়েছেন ঈশ্বরের কথা, এখন ওই চীনা লোক যদি মনে করে থাকেন অফিসের ‘বসে’র কথা? ভদ্রলোক যদি বলেই ফেলতেন বন্ধুর উদ্দেশে, ‘ঠিক আছে, আপনার ওপরওয়ালার সঙ্গে না হয় আলাপ করব ও-বিষয়ে’ তাহলে? তাহলে কি বিপদ হতো না?

আসল ওপরওয়ালা অবশ্য ওই ‘বস’ই। অন্য কেউ নয়। তাঁকে ছাড়া চলে না। তাঁর জোরে গরম হই, তাঁর ভয়ে নরম হই। গরমে তিনি, নরমেও তিনি। তিনি না থাকলে অচল হয়ে যাবে সবকিছু মুহূর্তেই। কে দেবে ধমক? আর ধমক না খেলে আমরা চলব অন্য কার অনুপ্রেরণায়?

আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক। এই আমলাতন্ত্র ওই দন্ত্য ‘ন’-এর লাঠির ওপর ভর করেই চলে। মান্য করি বলেই মান্যবর তিনি, নইলে দিগম্বরেরা কে কাকে সালাম করে? কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তারা একটি বিতর্কে জড়িয়েছে। প্রশ্নটা এই: শিক্ষা আমাদেরকে আমলাতান্ত্রিক করছে, নাকি আমলাতন্ত্রই এই শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে? খুবই দার্শনিক প্রশ্ন, সন্দেহ কী। আমিও দার্শনিকভাবেই বলি, দুটোই সত্য। মিথ্যা বলিনি কিন্তু। মুরগি আগে, না ডিম আগে—এ নিয়ে তর্কাতর্কি অচল নয়, কিন্তু তাই বলে মিথ্যা নয় এই সত্য যে ডিমও সত্য মুরগিও সত্য। আমলারাই শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং শিক্ষাব্যবস্থাও সমানে আমলা তৈরি করে চলেছে।

আমলা কে? আমলা হচ্ছেন সেই প্রাণী, যিনি ঠিক শাসক নন, সর্বদাই প্রশাসক। বাঁশের চেয়ে যেহেতু কঞ্চি বড়, তাই প্রশাসকের তেজ বেশি শাসকের চেয়ে। ওপরওয়ালার কাছে ভিজে ন্যাকড়াটার মতো নরম হন, আর তারই সুদাসলে ক্ষতিপূরণ আদায় করেন অধস্তন কর্মচারী ও অসহায় জনসাধারণের ওপর ভীষণ রকম গরম হয়ে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সংবাদে যে আহ্লাদে আটখানা হব, সেটা হয়ে ওঠে না ওই এক ভয়ে; সারা দেশময় আবার না আমলাতান্ত্রিকতারই শুধু বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে। বাঘের যেমন ফেউ, আমলার তেমনি টাউট। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার কারণে টাউটের সংখ্যা কী হারে বাড়ছে, দেখছেন এই বন্ধ্যাভূমিতে?

শিক্ষালয় থেকেই বেরিয়ে আসছেন এই আমলারা। কিন্তু এই শিক্ষালয় কোনো একটি বিশেষ বিদ্যায়তন নয়, দেশজুড়েই এর বিস্তার, সে জন্য দেখা যায়, যে-লোক মোটেই শিক্ষিত নয়, কিন্তু পয়সা করে ফেলেছে, পুত্র-কন্যার বিয়েশাদির সময় সে ব্যবসায়ী খোঁজে না, আমলাই খোঁজে এবং নিজেরও ইচ্ছা করে আমলা হবে, আমলাদের যে সমস্ত ঠাটবাট, দবদবা, রবরবা, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, আরদালি-বেয়ারা সেই সব করায়ত্ত করবে। অনেকে আছে মালিক হতে ভয় পায়, ম্যানেজার হতে চায়। মালিক হলে ঝামেলা অনেক। পরিশ্রম আসে, ঝুঁকি আনে, পুঁজি সংগ্রহের ব্যাপারটা তো রয়েছেই। ম্যানেজার হলে গাছেরটাও পাচ্ছে, তলেরটাও কুড়াচ্ছে।

এমনকি শিক্ষকদেরও অনেককে দেখেছি, আমলা হতে পছন্দ করেন। প্রথম জীবনে সরকারি কর্মচারী ছিলেন, পরে শিক্ষক হয়েছেন এমন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সম্পর্কে শুনেছি, শিক্ষকতার কাজ নিয়ে সবকিছুই ভালো লেগেছিল তাঁর, লাগেনি শুধু ওই ব্যাপারটা যে বেল টিপলে এখন আর বেয়ারা দৌড়ে আসে না, ঘন ঘন মিটিং থাকে না, যখন-তখন যে-সে তাঁর কামরায় ঢুকে পড়ে হুট করে। সর্বোপরি অধস্তন কর্মচারী নেই গাদাখানেক। অভাবের তালিকাটা অবশ্যি আরও বড় করা যায়, বলা যায়, চেয়ারের পেছনে তোয়ালেটাও পাওয়া যায় না। অন্যদিকে আবার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদেরও দেখেছি যে মুহূর্তে সরকার থেকে আহ্বান আসে কোনো চাকরির, অমনি আর ধরে রাখা যায় না, অতি দ্রুত গিয়ে হাজির হন এবং চাকরি শেষে ফিরে এলে বড়ই ম্রিয়মাণ হয়ে থাকেন। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ব্যবহারটা যে সহজ থাকে, তা-ও নয়। অভিযোগ আছে, অনেকেই ভাব করেন নৈর্ব্যক্তিকতার, ছাত্রছাত্রীদের দূরে রাখেন যতটা দূরে রাখা যায়।

নামজাদা শিক্ষকদের বিষয়েও শোনা যায় বিচার করা শেখান না, শুধু বিশ্লেষণ করা শেখান। এটাও হতে পারে, আবার ওটাও হতে পারে বলে নবীন শিক্ষার্থীদের দোদুল্যমান রাখেন। যথার্থ আমলাদের মতো। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামন্তবাদ চলে গেছে হয়তো, কিন্তু তাই বলে সম্পর্কটা মোটেই গণতান্ত্রিক হয়নি। ছাত্রকে সমান মনে করা খুবই কঠিন আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থায়, এমনকি উচ্চশিক্ষার স্তরেও তাই।

সবচেয়ে সহজ, স্বাভাবিক, অনানুষ্ঠানিক এবং কম পোশাকি হওয়ার কথা যে সম্পর্কটা, তারই যখন এই দশা, তখন অন্য সব সম্পর্ক যে এই সুরেই বাঁধা থাকবে, তাতে সন্দেহের অবকাশ কোথায়? তা বাঁধা আছেও। সেইভাবে আছে। আমলারা আছেন, আর গো-বিটুইন টাউটরা আছেন।

এই যে গো-বিটুইন শব্দটা ব্যবহার করলাম, এর বাংলা কী? না, বাংলা নেই। অনেক শব্দেরই বিকল্প নেই। দেখা তো যাচ্ছে, এমনকি ইংরেজিরও কোনো বিকল্প নেই আমাদের জন্য। যে জন্য পারলেই ইংরেজির দিকে ছুটি। ভেতরে এখনো আছে সেই অতিগভীর ও অতিপুরাতন আমলাতান্ত্রিকতা। অন্যদের কথা কী বলব, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোনো কোনো শিক্ষককেও দেখি ইংরেজিতে কিছু লিখতে পারলে অত্যন্ত আত্মসন্তুষ্ট হন।

প্রায়ই কথা ওঠে, ‘বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাটা কতটা প্রগতিশীল হতে পারে।’ আমার নিজের ধারণা, এ ভূমিকা ততটাই প্রগতিশীল হবে যে পরিমাণে আমরা মুক্ত হতে পারব ওই আমলাতান্ত্রিকতার হাত থেকে। নইলে দন্ত্য ‘ন’, ওপরওয়ালার মুখাপেক্ষিতা ও ইংরেজি লেখার প্রাণপণ প্রয়াসেই কেটে যাবে সময়, যেমন যাচ্ছে এখন। এবং একাধিকবার স্বাধীন হয়েও স্বাধীন হওয়া যাবে না।

সুকুকের সাফল্যের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী

ঝিনাইদহের লজ্জা

উত্তাল বেলুচিস্তান: পাকিস্তান কি আরেকটি ১৯৭১-এর ছায়ার মুখোমুখি

পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে না

বিশ্বকে আবার ভূতের ভয়, বামপন্থার ভূত

গুরুর মান-অপমান ও হিতোপদেশের গল্প

টাকার সামনে তো অসহায় বাঘা বাঘা সব বুদ্ধিজীবী: আবুল কাসেম ফজলুল হক

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংকট

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ভাবনা