হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

দ্বন্দ্ব ছিল, দ্বন্দ্ব থাকবেই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রাষ্ট্রভাষার বিষয়টা তো দ্বন্দ্বেরই ঘটনা একটা। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব। বাংলা ভাষার কপালেই ছিল এটা যে, একেবারে শুরু থেকেই তাকে যুদ্ধ করে এগোতে হবে; যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। রাষ্ট্র কখনোই তার পক্ষে ছিল না। এত শত বছর পরে, হাজার বছরের ইতিহাস পার হয়েই আসলে বাংলা ভাষা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে রাষ্ট্রভাষায়, কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের অবসান যে হয়েছে, তা বলা যাবে না। রাষ্ট্র বিদেশমুখো, সমাজের অধিপতি শ্রেণি বাইরে যা-ই বলুক, ভেতরে ইংরেজিই পছন্দ করে, উচ্চশিক্ষার ভাষা এখন অবশ্যই ইংরেজি।

সমস্যাটাই দ্বন্দ্বের ব্যাপার। অবশ্যই। দ্বন্দ্বের শেষ নেই, আসলেই। শেষ হওয়ার উপায়ও নেই। এমনকি মীমাংসা হবে বলে যে মনে করি তা-ও হয় না, একটি বাস্তবতা থেকে আরেকটি বাস্তবতায় উন্নতি ঘটে মাত্র, সেখানেও দ্বন্দ্ব থাকে, নিম্নের স্তরে যেমনটি ছিল। এই সত্যটা না বুঝলে অনেক কিছুই বোঝা যায় না—সমাজের নয়, ব্যক্তিরও নয়।

আমাদের কালেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল। কেন ঘটল বুঝতে হলে খবর নিতে হবে ওই দ্বন্দ্বের। একটি দ্বন্দ্ব ছিল সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের। তার বিষয়ে সোভিয়েত নেতৃত্ব সজাগ ছিল শুরু থেকেই। জানত সাম্রাজ্যবাদ সহ্য করবে না সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে, শেষ করে দেবে সুযোগ পেলেই। সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাই লড়তে হয়েছে যেমন হিটলারের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তেমনি আমেরিকাসহ সমগ্র সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের বিরুদ্ধে। সে যুদ্ধটা চলছিল। কিন্তু ক্রুশ্চেভের ক্ষমতা লাভের পর থেকে যখন ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি, তখন থেকেই দুর্বল হতে থাকল সে ভেতরে ভেতরে।

কেননা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বলতে বাস্তবে কিছু নেই, থাকা সম্ভব নয়। বাস্তবে আছে জয়, কিংবা পরাজয়। শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের জয় হলো, সমাজতন্ত্র পরাজিত হলো; তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে নয়, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে; তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র আছে এবং থাকবে।

আমাদের নিজেদের ইতিহাসেও বর্তমানে দ্বন্দ্বের কোনো অভাব নেই, ভবিষ্যতেও যে অভাব দেখা দেবে তা নয়।

একটা দ্বন্দ্ব ছিল বিদেশিদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ব্রিটিশ যুগে; সে যুগেই বিশেষভাবে। এই জন্য যে ওই কালের শাসকেরা সাম্রাজ্যকে যত গভীরে প্রবিষ্ট করে দিয়েছিল ততটা আর কেউ করতে পারেনি; এবং এই কারণেও যে ওইকালে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার বিষয়ে এ দেশের মানুষ সচেতন ছিল অন্য যেকোনো কালের তুলনায় অধিক পরিমাণে। প্রধান দ্বন্দ্বটা ছিল সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই।

সেই দ্বন্দ্বকে প্রধান করতে দিয়ে কখনো কখনো সামন্তবাদের সঙ্গে জনগণের যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেটাকে লক্ষই করা হয়নি; বরং সামন্তবাদী মনোভাবকে উৎসাহিত করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলন। এই আন্দোলনের আন্তরিকতা ও লক্ষ্য উভয় ব্যাপারেই কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু ওই বাঘ ও নেকড়ের ব্যাপারটি ঘটে যাচ্ছিল এ ক্ষেত্রেও; সাম্রাজ্যবাদের বাঘকে রুখতে গিয়ে পথ ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল সামন্তবাদী নেকড়েদের—শক্তিশালী হতে এবং উৎপাত করতে। সামন্তবাদ সেকালের অর্থনীতিতে ছিল, অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্র কৃষি, সেখানে সে-ই ছিল প্রধান সত্য; আর ছিল সংস্কৃতিতে—ভক্তি, আধ্যাত্মবাদ, কুসংস্কার, বহির্জগৎবিমুখতা, অভাব ছিল না এসবের কোনো কিছুরই।

সামন্তবাদও যে সমাজপ্রগতির শত্রুপক্ষ এই সহজ সত্যটিকে অস্বীকার করে শুধু নয়, সামন্তবাদকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে, ধর্মতান্ত্রিকতা ও বহির্জগৎবিমুখিতাকে প্রশ্রয় দিয়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠল, তার প্রবলতার ভেতরেই রয়ে গেল মস্ত এক দুর্বলতা। যার নাম সাম্প্রদায়িকতা। সে দুর্বলতা যে কত নিষ্ঠুর ও ক্ষতিকর, তা আমরা সইতে সইতে বুঝেছি এবং এখনো শেষ হয়নি সহ্য করার ও বোঝার। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বটাই ছিল প্রধান; কিন্তু তাই বলে সামন্তবাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বটাও উপেক্ষার বিষয় ছিল না, অবশ্যই বিষয় ছিল না উৎসাহ প্রদানের; কিন্তু উৎসাহই তো দেওয়া হয়েছে। ফলে সাতচল্লিশের স্বাধীনতার লড়াই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে। এত বড় কলঙ্ক ও ক্ষতি কম দেশকেই বহন করতে হয়েছে, যা আমরা করেছি আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমস্ত বড়াইকে কাঁধে নিয়ে।

হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বটা অবাস্তবিক ছিল না। বিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা হলো হিন্দু মধ্যবিত্তের সঙ্গে মুসলিম মধ্যবিত্তের, প্রতিষ্ঠিতের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকামীর, সেটি জনগণের দ্বন্দ্ব ছিল না; খেতে, কারখানায়, হাটে-মাঠে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র হিন্দু এবং মুসলিম ছিল ভাই ভাই; তারা একসঙ্গে কাজ করেছে, পাশাপাশি বসবাস করেছে, যুগের পর যুগ ধরে; বিরোধ নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সেটা সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়নি।

কিন্তু নিষ্ঠুর, স্বার্থপর মধ্যবিত্ত নিজেদের দ্বন্দ্বটাকে পরিণত করল সমগ্র জনগণের দ্বন্দ্বে। সাম্রাজ্যবাদ খুশি হলো এবং উৎসাহ দিল। রক্তাক্ত হলো দেশ, ভ্রাতৃরক্তে।

তারপরে পাকিস্তান হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় গঠন-চরিত্রের কারণে প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে দাঁড়াল পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের। অপ্রধান দ্বন্দ্বটা শ্রেণিগত—ধনীর সঙ্গে গরিবের। প্রধান দ্বন্দ্বকে বাঙালি মধ্যবিত্ত প্রথমে চিনতে চায়নি, সেটাও ছিল খুবই স্বাভাবিক। কেননা, নতুন রাষ্ট্র নিয়ে এসেছে কিছু নতুন সুযোগ; হিন্দু-মুসলিম খুনোখুনির মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি, এখন আবার এর বিরুদ্ধে যাব কেন? তার চেয়ে বরং সুযোগ যা পাওয়া যায় সংগ্রহ করে নেওয়া ভালো—মনোভাবটি ছিল এই রকমের। কিন্তু মধ্যবিত্তেরই তরুণ অংশ কী ঘটতে যাচ্ছে তা বুঝে নিল। যে ঘটনা ব্রিটিশ যুগে ঘটেছে, সেই ঘটনা

পাকিস্তান আমলেও ঘটল, রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। পাকিস্তান যে বাঙালির রাষ্ট্র হবে না, এটা তরুণের কাছে স্পষ্ট হলো ভাষার প্রশ্নে। তার পক্ষে সম্ভব হলো না চুপ করে বসে থাকা।

ওইটেই প্রধান দ্বন্দ্ব, বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরোধ। মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান সেটা বুঝেছিলেন, বুঝে নিজেদের রাজনীতিতে সেই বিরোধকে প্রতিফলিত করেছিলেন। শেখ মুজিব করলেন বিশেষভাবে, যে জন্য তিনিই শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব দিলেন পাকিস্তান ভাঙার আন্দোলনে।

শ্রেণি দ্বন্দ্বও ছিল। কিন্তু জাতীয় দ্বন্দ্বের প্রশ্নটিকে পাশ কাটিয়ে যে শ্রেণি দ্বন্দ্বের প্রশ্নটিকে তার যৌক্তিক পরিণতিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, এটি বামপন্থীরা বুঝতে পারলেন না। শ্রেণির প্রশ্নে আওয়ামী লীগ চিন্তিত ছিল না, তার কাছে প্রশ্ন একটাই, সেটি জাতির। বামের জন্য বিবেচনায় বিষয় শ্রেণি এবং জাতি দুটোই হওয়ার কথা ছিল, কেননা ওই যে বললাম জাতি না পার হলে শ্রেণিতে পৌঁছা যায় না। আগে দেশকে স্বাধীন করা চাই, মুক্তি চাই জাতিসত্তার, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠবে শ্রেণির বিবেচনা, এটা তো বড়ই সত্য কথা। জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে শ্রেণি অবশ্যই থাকবে, শ্রমজীবী মানুষই প্রকৃত অর্থে মুক্ত করতে পারবে জাতিকে, কেননা তারাই অধিক সংখ্যায়, তারাই সর্বাধিক আপসবিমুখ এসব ব্যাপারে। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন বাম দলগুলো জাতীয় প্রশ্নটিকে স্থগিত রেখে শ্রেণির প্রশ্নটিকে প্রধান করে তুলল। তারা ভাবল গোটা পাকিস্তানে তাদের আন্দোলন চলবে, সমগ্র পাকিস্তানে শ্রমজীবী মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাঙালি তাতে তেমন সাড়া দিল না, কেননা বাঙালির সামনে তখন প্রধান সত্য পাঞ্জাবির শোষণ; সেই শোষণের সে অবসান চায়, তাই ওই নামে ডাক দিল যে প্রতিষ্ঠান তার পতাকাতলে গেল সে সোৎসাহে।

অনিবার্য ছিল পাকিস্তানের ভাঙন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের মতোই। ভাঙল সে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশে জাতিগত সমস্যার মীমাংসা হয়ে গেল, প্রধান হয়ে দাঁড়াল তখন শ্রেণির সমস্যা। মধ্যবিত্তের একাংশ ধনী হয়ে পড়ল দ্রুত এবং পরিণত হলো শোষণকারীতে; ওদিকে গরিব মানুষ আরও গরিব হলো ক্রমাগত। শেখ মুজিব কি ভুল করেছিলেন যখন তিনি নকশালদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন? না, মোটেই না। সেটাই ছিল স্বাভাবিক, তাঁর তখনকার অবস্থানের জন্য। মুক্ত বাংলাদেশে তাঁর অবস্থান বদলে গেছে, এখন তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত নন, এখন তিনি রাষ্ট্রের কর্ণধার, যে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি রাখল না, জনগণের হলো না এবং রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দরিদ্র মানুষের বিপক্ষে তিনি, দরিদ্রের পক্ষে যারা তাদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তো বাধবেই। বাকশাল করাটাও স্বাভাবিক ছিল তাঁর অবস্থানের কারণেই, কেননা তিনি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে স্তব্ধ করে তাকে পরিচালিত করতে চাইছিলেন বিপরীত দিকে। হয়তো তিনি বুঝতে পারেননি তিনি কী করছেন, তাঁর অবস্থানই তাঁকে পরিচালনা করছিল নির্মমভাবে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

৫ টাকার অফিসার ও ভোট গ্রহণে টিমওয়ার্ক

জ্যামিতি, বিজ্ঞান ও সমাজ

ভাষা, ব্যাকরণ ও ছাগল

অঙ্গীকারের মেঘ ঝরুক প্রাপ্তির বৃষ্টি হয়ে

ভোটের ডামাডোলে চাপা বন্দর রক্ষা

কীভাবে একটি চুক্তি নতুন করে লিখে দিল জ্বালানিনির্ভরতা

‘না’ বিজয়ী হলে রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রায়ণ করার সুযোগ হাতছাড়া হবে: আলী রীয়াজ

সুষ্ঠু নির্বাচনের জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে তো

ডিএনসিসির বাড়িভাড়া নির্দেশনা: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

নির্বাচনের জন্য সবাই প্রস্তুত, তবু কেন সংশয় জনমনে