একজন তরুণ চাকরির ভাইভা দিতে গেলেন। হাতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ, সিজিপিএও ঈর্ষণীয়। নিয়োগকর্তা তাঁকে একটি প্রশ্ন করলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন সমস্যাটি আপনি সমাধান করতে পারবেন?’ তরুণটি থমকে গেলেন। কারণ, প্রশ্নটি ডিগ্রি নিয়ে নয়, দক্ষতা নিয়ে। এটিই বর্তমানে চাকরির বাজারের বাস্তবতা। নিয়োগকর্তারা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারবেন এবং উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমন প্রার্থীই নিয়োগ দেন।
এখনকার সময়ে চাকরিপ্রার্থীর প্রত্যাশা ও নিয়োগদাতার চাহিদা এক নয়। বেশির ভাগ চাকরিপ্রার্থীর কাছে চাকরি মানে একটি স্থায়ী আয়, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু একজন নিয়োগদাতার কাছে চাকরি হলো একটি বিনিয়োগ। তিনি এমন কাউকে নিয়োগ দিতে চান, যিনি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়াবেন, সমস্যার সমাধান করবেন এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখবেন। ফলে একজন প্রার্থী চাকরির বিনিময়ে বেতন প্রত্যাশা করলেও নিয়োগদাতা সেই বেতনের বিনিময়ে মূল্য সংযোজন প্রত্যাশা করেন।
একসময় ভালো ডিগ্রি থাকলেই চাকরির সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেত। এখন সেই চিত্র বদলেছে। ডিগ্রি আপনার শিক্ষার পরিচয়। কিন্তু কাজের দক্ষতার প্রমাণ নয়। তাই নিয়োগকর্তার আগ্রহ এখন অন্য জায়গায়। আপনি কী জানেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—আপনি কী করতে পারেন।
আজকের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো— ‘আপনি কী জানেন?’ নয়। ‘আপনি কী সমাধান করতে পারেন?’ একজন মার্কেটিং পেশাজীবী যদি বিক্রি বাড়ানোর পথ না জানেন, তাঁর জ্ঞান খুব বেশি কাজে আসে না। একজন মানবসম্পদ কর্মকর্তা যদি মানুষের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারেন, তবে তাঁর তত্ত্বগত জ্ঞানও অসম্পূর্ণ। একজন গবেষক তখনই মূল্যবান, যখন তাঁর বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে আরও শক্তিশালী করে। শেষ পর্যন্ত সব পেশার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—সমস্যার সমাধান।
ইন্টারভিউয়ে অনেকে বলেন, ‘যেকোনো কাজ করতে পারব।’ শুনতে ইতিবাচক মনে হলেও নিয়োগকর্তার কাছে এটি আত্মবিশ্বাসের নয়, বরং অস্পষ্টতার পরিচয়। বরং বলুন, আপনি কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে চান। কী ধরনের সমস্যার সমাধান করতে পারেন। কোথায় আপনার শক্তি। কারণ, প্রতিষ্ঠান সাধারণ কর্মী খোঁজে না। খোঁজে নির্দিষ্ট কাজের উপযুক্ত মানুষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম একজন শিক্ষার্থীকে তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে দেয়। তবে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য বাস্তব দক্ষতার প্রয়োজন হয়। প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল টুল ব্যবহার, গবেষণা দক্ষতা, প্রকল্প পরিচালনা এবং ক্ষেত্রভিত্তিক অভিজ্ঞতা একজন প্রার্থীর কর্মদক্ষতাকে শক্তিশালী করে।
সব দক্ষতা বই থেকে শেখা যায় না। ভালোভাবে কথা বলা, মন দিয়ে শোনা, দল নিয়ে কাজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা দ্রুত নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া—এসব গুণ একজন পেশাজীবীর মূল্য অনেক বাড়িয়ে দেয়। প্রায়ই দেখা যায়, সমান ফলাফল থাকা দুই প্রার্থীর মধ্যে এগিয়ে যান সেই ব্যক্তি, যার সফট স্কিল ভালো।
এখন নিয়োগকর্তারা শুধু প্রার্থীর পড়াশোনা বা কাজ সম্পর্কে জানতে চান না; পাশাপাশি জানতে চান, সেখানে কী পরিবর্তন এনেছেন, কোন প্রকল্পে কাজ করেছেন, কী ফল এসেছে, কী শিখেছেন। এসব তুলে ধরা জরুরি। সুযোগ থাকলে একটি পোর্টফোলিওও তৈরি করুন। কাজের নমুনা অনেক সময় শত কথার চেয়েও শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে অভিজ্ঞতা বলতে শুধু চাকরির অভিজ্ঞতাকে বোঝায় না। ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবী কাজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প, ফ্রিল্যান্সিং এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। নিয়োগকর্তারা এখন এসব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। যদি সেখান থেকে শেখার গল্প থাকে, দক্ষতার প্রমাণ থাকে, তবে সেগুলোর মূল্যও কম নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মক্ষেত্র বদলে দিচ্ছে দ্রুত। অনেক প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে শেখাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। নতুন দক্ষতা অর্জন, প্রযুক্তি সম্পর্কে জানা এবং নিজেকে নিয়মিত উন্নত করার বিকল্প নেই।
বর্তমান চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ডিগ্রির নয়, সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতার। প্রতিষ্ঠান শুধু কর্মী নিয়োগ দেয় না, তারা এমন মানুষ খোঁজে, যিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য দৃশ্যমান মূল্য তৈরি করতে পারবেন। তাই নিজেকে শুধু একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, একজন সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে গড়ে তুলুন।
মুত্তাকিন হাসান, প্ল্যান্ট এইচআর হেড, রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড