সাক্ষাৎকার

‘লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বাস্তব জীবনের আরও কাছাকাছি’

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাহিত্যকর্ম নিয়ে জা রুবেঝোম পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন স্প্যানিশ ভাষা থেকে বই অনুবাদক সেন্ট পিতেরবুর্গ স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং সম্পাদক দারিয়া সিনিৎসিনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মারিয়া সেদনিয়েভা

বিশ্বজুড়ে আবারও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে আগ্রহের নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে কলম্বিয়ার ম্যাজিক রিয়ালিজম ধারার কিংবদন্তি লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের। কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই ‘আগস্টে দেখা হবে’ (ইংরেজিতে আনটিল আগস্ট, রুশ ভাষায় ‘আগস্টে দেখা হবে’ নামে অনুবাদ করা হয়েছে)। বইটি লেখকের খসড়া ও বিচ্ছিন্ন নোট থেকে সংকলিত একটি রচনা। আর গত বছরের শেষ দিকে বহুদিনের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ আবারও নতুনভাবে আলোচনায় আসে, যখন নেটফ্লিক্স একই নামে উপন্যাসটির ওপর ভিত্তি করে একটি সিরিজ প্রকাশ করে।

তবে লাতিন আমেরিকার খ্যাতি শুধু মার্কেসকে ঘিরে নয়। এই অঞ্চলের আরও বহু বিশিষ্ট লেখকের নাম রয়েছে সাহিত্যের জগতে। মজার বিষয় হলো, চিলির লেখকদের উপন্যাস পেরুর লেখকদের উপন্যাসের মতো নয়— বিষয়বস্তু, জীবনযাত্রার বর্ণনা এমনকি ভাষার ব্যবহারও ভিন্ন। যদিও অনেক দেশে স্প্যানিশ ভাষা বলা হয়, অঞ্চলভেদে সেই ভাষার রূপে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো কী, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সাহিত্য থেকে কতটা আলাদা, সমাজতান্ত্রিক কিউবায় কঠোর সেন্সরশিপ আদৌ আছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে জা রুবেঝোম পত্রিকার সঙ্গে কথা বলেছেন স্প্যানিশ ভাষা থেকে বই অনুবাদক সেন্ট পিতেরবুর্গ স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং সম্পাদক দারিয়া সিনিৎসিনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মারিয়া সেদনিয়েভা।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আপনি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের শেষ রচনা ‘আগস্টে দেখা হবে’ অনুবাদ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর আত্মীয়স্বজন বলেছিলেন, মার্কেস নিজেই এই খসড়া নিয়ে খুব সন্তুষ্ট ছিলেন না, কয়েকবার পুনর্লিখন করেছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করতে পারেননি। আপনার মতে, বইটি কতটা সফল হয়েছে? এই মার্কেস কি এখনো সেই একই মার্কেস?

দারিয়া সিনিৎসিনা: নিঃসন্দেহে, এটি গার্সিয়া মার্কেসেরই লেখা। আসলে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিজে থেকেই অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। লেখকের বিভিন্ন রচনার শৈলী ভিন্ন, আর ‘আগস্টে দেখা হবে’ অনেক দিক থেকেই তাঁর শেষজীবনের অন্যান্য কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে লেখাটি নিয়ে কাজ করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে যেতে পারেননি। আমাকে অনুবাদের জন্য যা পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল সম্পাদক কর্তৃক একত্র কিছু খণ্ডাংশ ও নোটের সমষ্টি। শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা তৈরি হয়েছে, যদিও কিছু সূক্ষ্ম অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে।

অনুবাদের জটিলতা মূলত এখানেই ছিল—লেখাটিকে আরও সুসংহত করে তোলা দরকার ছিল। কিন্তু সন্দেহ নেই, এটি গার্সিয়া মার্কেসেরই সৃষ্টি। যদি ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কোনো বিশেষজ্ঞকে পাঠটি দেওয়া হয়, তিনি নিশ্চিতভাবেই বলবেন—হ্যাঁ, এটি সেই একই লেখকের লেখা। যদিও এর ভাষাশৈলী কিছুটা শুষ্ক, তাঁর বড় উপন্যাসগুলোর মতো নয়; বাক্যগঠনও তুলনামূলকভাবে সংযত। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বইটি ভালো, যেমনটি মার্কেসের কাছ থেকে আশা করা যায়। অন্তত কল্পনা করা সবচেয়ে খারাপ কিছু নয়।

মারিয়া সেদনিয়েভা: অনেক সময় মৃত্যুর আগে লেখা সাহিত্যকর্মে একধরনের কৃত্রিমতা বা জোর করে টেনে নেওয়ার অনুভূতি থাকে। এখানে কি তেমন কিছু মনে হয়?

দারিয়া সিনিৎসিনা: সম্ভবত, হ্যাঁ। তবে সেটা মূলত এই কারণে যে বইটি অবশিষ্ট অংশগুলো জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আর সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপের চিহ্নও অবশ্যই চোখে পড়ে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: একজন অনুবাদক হিসেবে আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী ছিল? আপনি ইতিমধ্যে লেখাটিকে সুসংহত করার কথা বললেন। শৈলীও কি পরিবর্তন করতে হয়েছে?

দারিয়া সিনিৎসিনা: না, সেখানে মূলত কিছু প্রযুক্তিগত বিষয় ছিল, যেমন সামান্য কালানুক্রমিক অসামঞ্জস্য। কারণ, আমার কাছে তৈরি বইটি ছিল না, এটি সারা বিশ্বে একই সময়ে প্রকাশিত হচ্ছিল। কাজের প্রস্তাবের সঙ্গে একটি পাসওয়ার্ড-সুরক্ষিত ওয়ার্ড ফাইল পাঠানো হয়েছিল। সম্ভবত স্প্যানিশ সংস্করণ প্রকাশের সময় যুক্তিগতভাবে আরও পরিশীলিত ছিল। কিন্তু যেহেতু আমার সেটিতে প্রবেশাধিকার ছিল না, তাই আমি যতটা সম্ভব কালানুক্রমিক অসংগতি দূর করেছি, যাতে পুরো বিষয়টি একেবারে অযৌক্তিক না লাগে।

শৈলীর দিক থেকে এটি গার্সিয়া মার্কেসের জন্য বেশ পরিচিত—তাঁর স্বভাবসুলভ রূপক, পুনরাবৃত্ত ধারণা সবই রয়েছে। আমি তাঁকে খুব ভালোবাসি এবং অনেক পড়েছি, তাই অনেক কিছুই আমার কাছে পরিচিত ছিল; এ দিক থেকে খুব বেশি সমস্যা হয়নি।

মারিয়া সেদনিয়েভা: মার্কেসকে অনুবাদ করার সময় কি বিশেষ কোনো অসুবিধা হয়, বিশেষত যখন তাঁর রচনাগুলো ইতিমধ্যে বহুবার অন্য অনুবাদকেরা অনুবাদ করেছেন? তাঁর ভাষাশৈলীর জটিলতা আসলে কোথায়, যা হয়তো রুশ ভাষায় রূপান্তর করা কঠিন? আর অনুবাদের সময় আগের অনুবাদগুলোকে কতটা মাথায় রাখতে হয়?

দারিয়া সিনিৎসিনা: আমি অন্য অনুবাদগুলোর দিকে তাকাইনি। কারণ, রুশ ভাষায় সম্ভবত আমি শুধু ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ এবং আরও কিছু লেখা পড়েছিলাম, সেটাও কৈশোরের শুরুতে। অনেক বছর ধরে আমি গার্সিয়া মার্কেসকে শুধু স্প্যানিশ ভাষাতেই পড়ছি। তাই তাঁর বইগুলোর বিদ্যমান রুশ অনুবাদকে আমি কোনো মানদণ্ড হিসেবে নিইনি—সত্যি বলতে, সেগুলো পড়াই হয়নি। ‘প্যাট্রিয়ার্কের শরৎ’-এর ক্ষেত্রে আমি কার্লোস শেরমান ও ভ্যালেন্তিন তারাসের অনুবাদ পড়েছিলাম, তবে নিজের কাজ জমা দেওয়ার পর।

মূল স্প্যানিশ ভাষায় গার্সিয়া মার্কেসের একটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা নিয়ে পাঠকদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন। কেউ এ জন্য তাঁকে ভালোবাসে, কেউ আবার না। বিষয়টি হলো তাঁর অস্বাভাবিক বাক্যপ্রয়োগ, বিশেষ করে মানবিক অনুভূতি নিয়ে লেখার সময়; যেমন তিনি প্রেম বা নিঃসঙ্গতা নিয়ে যেভাবে লেখেন, যে ধরনের রূপক ব্যবহার করেন। অনেকের কাছে সেগুলো অত্যন্ত নিখুঁত মনে হয়, আমার কাছেও তা-ই লাগে, আবার অন্যদের কাছে সেগুলো প্রায় অদ্ভুত বা অবাস্তব ঠেকে।

এই বর্ণনাগুলো মূল ভাষাতেও অস্বাভাবিক শোনায়। একদিকে তাঁর ভাষা খুব স্বাভাবিক ও জৈবিক, অন্যদিকে কোনো বাক্য পড়লেই বোঝা যায় এটি গার্সিয়া মার্কেসের লেখা এমনকি লেখকের নাম উল্লেখ না থাকলেও। তাঁর এসব বাক্যগঠন অনেক সময় স্প্যানিশ ভাষাভাষীদের কাছেও অচেনা বা অস্বাভাবিক শোনায়। আমার মনে হয়, এগুলো যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করা উচিত। কারণ, এগুলোই লেখকের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কাজটি সহজ নয়, কারণ তিনি প্রায়ই দীর্ঘ বিশেষ্য-শৃঙ্খল ব্যবহার করেন এবং বড়, সুন্দর বাক্য নির্মাণ করেন, বিশেষ করে তাঁর বৃহৎ উপন্যাসগুলোতে। সেগুলো অনুবাদ করা কঠিন, তবে সব সময় আকর্ষণীয়।

মারিয়া সেদনিয়েভা: সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ অবলম্বনে একটি সিরিজ প্রকাশিত হয়েছে। অনেক সমালোচকের মতে, এটি উপন্যাসটির আবহ খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছে। আপনি কি সিরিজটি দেখেছেন? সমালোচকদের সঙ্গে কি একমত?

দারিয়া সিনিৎসিনা: সামগ্রিকভাবে সিরিজটি আমার ভালো লেগেছে। শিল্পনির্দেশকেরা দারুণ কাজ করেছেন, দৃশ্যগত দিকটি অত্যন্ত উচ্চমানের; চিত্রায়ণ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। অভিনেতা নির্বাচনও অসাধারণ, যদিও কিছু ক্ষেত্রে কাস্টিং নিয়ে আমি পুরোপুরি একমত নই, তবে সামগ্রিকভাবে সবকিছুই বেশ বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। তবে তিনটি বিষয় আমাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে।

প্রথমত, নিঃসঙ্গতার এক শ বছর উপন্যাসে চরিত্রগুলোর সংলাপ খুবই কম। আর সেই অল্প পরিমাণ সরাসরি কথোপকথন দিয়ে একটি টেলিভিশন সিরিজের পূর্ণাঙ্গ সংলাপভিত্তিক জগৎ তৈরি করা সম্ভব নয়। মানুষকে বইয়ের তুলনায় সিরিজে বেশি কথা বলতে হয়। কিন্তু আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে, যখন চরিত্ররা বইয়ের বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে কথা বলতে শুরু করে। আমার মনে হয়, এতে আবেগপ্রবণতা বা নাটকীয়তার মাত্রা মার্কেসের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, সিরিজটি বইয়ের তুলনায় অনেক কম হাস্যরসপূর্ণ। ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ আমার পড়া সবচেয়ে মজার বইগুলোর একটি (অন্তত উপন্যাসের প্রথমার্ধ তা-ই; আর সিরিজের প্রথম সিজনও মূলত সেই অংশ নিয়েই তৈরি)। কিন্তু সিরিজে হাস্যরস প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তৃতীয় পর্বে কয়েকটি প্রচেষ্টা দেখা যায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিদ্রূপ আর হাসি সেখান থেকে নির্বাসিত হয়েছে।

আর তৃতীয় বিষয়টি পুরোপুরি ব্যক্তিগত অনুভূতি। আমার মনে হয়, বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র প্রাপ্তবয়স্ক রেবেকা দেখতে অনেকটা রেজিনা তোদোরেঙ্কোর মতো। আমি এই মিল মাথা থেকে সরাতে পারছি না, আর এটা আমাকে ভীষণ বিরক্ত করে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আপনার মতে, এ ধরনের বইকে পর্দায় রূপ দেওয়ার আদৌ কোনো মানে আছে? নাকি সত্যিই বইয়ের পাতায় দেখা ভালো?

দারিয়া সিনিৎসিনা: অবশ্যই এর মানে আছে। উদাহরণস্বরূপ, কত মানুষ ‘দি লর্ড অব দ্য রিং’কে বই হিসেবে ভালোবাসে, আর কত মানুষ চলচ্চিত্রের জন্য? অথবা ‘হ্যারি পটার’কে কতজন বইয়ের আকারে বেশি পছন্দ করে, আর কতজন চলচ্চিত্ররূপে? পৃথিবী বদলে গেছে, আর এখন অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যম আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদি কেউ সিরিজ দেখে উপন্যাসটি পড়তে আগ্রহী হয়, সেটাই বড় সাফল্য। তাই অবশ্যই এমন সিরিজ থাকা উচিত। এটি যথেষ্ট ভালো, বরং বলা যায়, খুবই ভালো। তারা সঠিক কাজ করেছে প্রকল্পটি কলম্বিয়ানদের হাতে তুলে দিয়ে। এতে সত্যিই একটি স্বতন্ত্র বাস্তবতা ও স্বকীয়তা এসেছে। আমি গত বছর কলম্বিয়ায় ছিলাম, আর সিরিজে যেসব জায়গা দেখানো হয়েছে, সেগুলো বাস্তব জায়গাগুলোর সঙ্গে সত্যিই অনেকটা মিলে যায়। অবশ্যই সময়ের পার্থক্য আছে, কিন্তু সেই অঞ্চলগুলোতে খুব বেশি কিছু বদলায়ও না।

মারিয়া সেদনিয়েভা: বলা যায় কি অনুবাদ লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতিকে অন্য ভাষা ও প্রেক্ষাপটে নিয়ে যেতে গিয়ে অনিবার্যভাবে কিছু হারিয়ে ফেলে? নাকি অনুবাদ বরং লেখার নতুন দিক উন্মোচন করে?

দারিয়া সিনিৎসিনা: আদর্শভাবে অবশ্যই অনুবাদ এমন হওয়া উচিত, যাতে মূল রচনার কিছুই হারিয়ে না যায়, আবার নতুন কিছু যোগও না হয়। অনুবাদও মূলত মূল লেখার মতোই একটি লেখা, শুধু অন্য ভাষায়। কিন্তু বাস্তবে তা কখনোই পুরোপুরি সম্ভব হয় না। কিছু না কিছু হারানো অনিবার্য। কারণ, সেখানে সব সময় একজন মধ্যস্থতাকারী থাকে। আর আমি সেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অনিবার্যভাবে কিছু না কিছু নিজের দিক থেকে যোগ করব। হয়তো সচেতনভাবে তা করতে চাই না এবং তা এড়ানোর চেষ্টা করি, তবু কোনো না কোনোভাবে কিছু বিষয় লেখার মধ্যে ঢুকে পড়ে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: উদাহরণ হিসেবে বললে, কী হারিয়ে যেতে পারে বা নতুনভাবে যুক্ত হতে পারে?

দারিয়া সিনিৎসিনা: আমরা সবাই এমন কিছু বাস্তবতার মধ্যে বাস করি, যা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ। এই বাস্তবতা এতটা প্রবল যে আমরা প্রায়ই সেগুলো টের পাই না। কারণ, আমরা তার ভেতরেই আছি। কিন্তু যদি হঠাৎ আমাদের কোনো আফ্রিকান গ্রামে বা বিশাল কোনো চীনা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে আমরা সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ব। কারণ, সেখানে বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা, আর কোনো আফ্রিকান বা চীনা লেখক যখন বই লেখেন, তখন সম্ভবত তিনি এসব বিষয় আলাদা করে ব্যাখ্যাও করেন না। কারণ, তিনিও তো সেই বাস্তবতার মধ্যেই বাস করেন।

তাই অনূদিত পাঠ যেন পাঠকের কাছে কিছুটা হলেও বোধগম্য হয়, সে জন্য কখনো কখনো একটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়; যেমন শুধু কোনো পাখির নাম উল্লেখ করলেই হয় না, কখনো যোগ করতে হয় সেটি কেমন পাখি, দেখতে কেমন কিংবা সেই দেশের সংস্কৃতিতে তার বিশেষ তাৎপর্য কী—এ ধরনের বিষয়ও।

এ ছাড়া মূল্যবোধগত কিছু পার্থক্যও থাকে। কলম্বিয়ানরা কোনো বিষয়কে একভাবে দেখে আর আমরা দেখি অন্যভাবে। এতে কখনো বিস্ময় বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, যদিও আসলে এটি কেবল সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। একজন অনুবাদকের কাজ এটা বিচার করা নয় যে বিষয়টি ভালো না খারাপ। উদাহরণ হিসেবে মোরগের লড়াইকে ধরা যায়। একদিকে এটি খারাপ মনে হতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে এটি এমন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যেখান থেকে অসংখ্য প্রথা ও রীতি জন্ম নিয়েছে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আপনি কেন বিশেষভাবে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? এতে এমন কী আকর্ষণ আছে?

দারিয়া সিনিৎসিনা: আমি স্প্যানিশভাষী সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেছি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মাধ্যমে। তিনি আমার খুব প্রিয় ছিলেন, আর আমি তাঁর অনেক লেখা পড়েছি। ধীরে ধীরে স্প্যানিশভাষী সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ আরও বিস্তৃত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমি স্পেনের লেখকদেরও অনেক অনুবাদ করছি, যদিও সামগ্রিকভাবে এখনো লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়েই বেশি কাজ করি।

লাতিন আমেরিকায় সংস্কৃতি ও ভাষার যে বিপুল বৈচিত্র্য, তা অসাধারণ—সেখানে ২০টি দেশ, আর প্রতিটি দেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে লাতিন আমেরিকার লেখাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগে; বিশেষ করে মানুষ কীভাবে কথা বলে, কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, জিনিসপত্র কীভাবে বর্ণনা করা হয়—এসব পর্যবেক্ষণ করতে। বলা যায়, আমি একধরনের ‘লাতিন আমেরিকা-অনুরাগী’।

মারিয়া সেদনিয়েভা: অর্থাৎ তাঁরা অনেক সময় নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখেন?

দারিয়া সিনিৎসিনা: হ্যাঁ। অথবা জোসেফ ব্রডস্কির মতো উদাহরণ ধরা যায়, যিনি স্কুলের পড়াশোনা শেষ না করে নিজে নিজেই শিক্ষা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ভাষা শিখেছিলেন, অসংখ্য বই পড়েছিলেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও মানুষ যে অসাধারণ লেখক হয়ে উঠতে পারে, লাতিন আমেরিকাতেও তার বহু উদাহরণ আছে।

সম্ভবত এর সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের সামাজিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে, যখন বামপন্থী আন্দোলন ও বিপ্লব শুরু হয় এবং আত্মশিক্ষার সুযোগও বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে রেইনালদো আরেনাসের কথা বলা যায়। তাঁর পরিবারের সবাই ছিলেন নিরক্ষর। কিন্তু কিউবান বিপ্লব শুরু হওয়ার পর তাঁর রাজধানীতে যাওয়ার সুযোগ হয় এবং ঘটনাক্রমে তিনি একটি গ্রন্থাগারে কাজ শুরু করেন। সেখানে এত পড়াশোনা করেছিলেন যে পরে তিনি কিউবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকে পরিণত হন।

মারিয়া সেদনিয়েভা: যদি বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকানো যায়, দেখা যায় আজকাল কোন বিষয়গুলো বেশি আলোচনায় আছে: নারীবাদ, সমকামী বা ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষের অধিকার, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন ইত্যাদি। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যেরও কি নিজস্ব কোনো ‘অ্যাজেন্ডা’ আছে? আর তা কি বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায়?

দারিয়া সিনিৎসিনা: আমার মনে হয়, এখন পৃথিবীতে সব ধরনের বিষয় নিয়েই লেখা হচ্ছে। মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে ভাবছে, সেসব নিয়েই সাহিত্য তৈরি হচ্ছে। লাতিন আমেরিকাতেও নানা ধরনের বিষয় আছে। বুকারের দীর্ঘ তালিকায় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে লেখা বই থাকলেই যে সবাই শুধু সেই বিষয়ে লিখছে, তা নয়। বরং এর অর্থ হলো, বুকার তালিকা প্রস্তুতকারীদের নিজেদের কিছু পছন্দ ও ঝোঁক রয়েছে।

লাতিন আমেরিকাতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অনেক বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে নারীবাদ অবশ্যই অন্যতম। এই অঞ্চলের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে নারীরা প্রায় অধিকারবঞ্চিত ছিলেন।

তবে এটাও বলতে হবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা প্রচারণামূলক সাহিত্য পছন্দ করি না। সেগুলো প্রায়ই শিল্পগুণের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন কোনো লেখক এমন কিছু নিয়ে লেখেন, যা তাঁর কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ—তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস, অনুভূতি ও প্রতিভার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তখন সেই লেখা স্বাভাবিকভাবেই জীবন্ত ও আকর্ষণীয় হয়।

অন্যদিকে যদি কেউ বসে ঠিক করে ‘আজ আমি অমুক সামাজিক ইস্যু নিয়ে লিখব’, তাহলে সেটা সাধারণত বোঝা যায়, আর সেই লেখা প্রায়ই হৃদয় থেকে আসা লেখার তুলনায় কম শক্তিশালী হয়। এমনকি প্রতিভাবান হলেও তা হৃদয়ের গভীরতা থেকে লেখা সাহিত্যের কাছে হার মানে।

একই সঙ্গে এটাও সত্য, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে বেশ সক্রিয় ও অবস্থাননির্ভর (অবশ্য সব সাহিত্য নয়, তবে বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনায় তা স্পষ্ট)। সেখানে প্রায়ই বাম ও ডান রাজনৈতিক শক্তির সংঘাত প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকে।

তবে আজকের পোস্টমডার্ন ও মেটামডার্ন যুগে সেই তীব্রতা কিছুটা কমে এসেছে। মানুষ ডানপন্থী ও বামপন্থী উভয় ধারার প্রতি অনেক ক্ষেত্রে হতাশ হয়েছে।

তবু সামাজিক বাস্তবতা এখনো প্রায় অপরিহার্য উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। শ্রমিক আন্দোলন, আদিবাসীদের অধিকার, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের সংগ্রাম—এসব বিষয় লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে অনিবার্যভাবেই উঠে আসে। কারণ, এই অঞ্চলের ইতিহাস গভীর সামাজিক সংঘাত ও প্রতিবাদে পরিপূর্ণ, যার পেছনে বহু ক্ষেত্রে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের উত্তরাধিকার কাজ করেছে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মধ্যে কি পার্থক্য আছে? যেমন আর্জেন্টিনা, চিলি এবং কিউবার মধ্যে?

দারিয়া সিনিৎসিনা: অবশ্যই, একটি সাধারণ ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। আমরা যেভাবে আমেরিকার ইতিহাস জানি, তা শুরু হয় ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং স্প্যানিশ বিজয়যাত্রার সময় থেকে, আর সর্বত্রই সেই ইতিহাস উপনিবেশবাদের সঙ্গে জড়িত। তবে প্রতিটি দেশে এই প্রক্রিয়া ভিন্নভাবে ঘটেছে।

বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশও একেবারে আলাদা ছিল। যদি মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এগুলো যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ। শুধু প্রকৃতির দৃশ্যপটের দিক থেকে পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট।

এ ছাড়া প্রতিটি অঞ্চলে নিজস্ব প্রাক্‌-কলম্বীয়, অর্থাৎ স্প্যানিশ আগমনের আগের সংস্কৃতি ছিল এবং সেসব সংস্কৃতির ভাগ্যও একেক জায়গায় একেক রকম হয়েছে। কোথাও আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিজয়ের কিছুদিন পরই প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়, আবার কোথাও আজও তারা সংখ্যায় অনেক এবং সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব রাখে।

কিছু দেশে আফ্রিকান সাংস্কৃতিক উপাদান খুব প্রবল, আবার কোথাও তা প্রায় নেই বললে চলে। আর কোথাও, যেমন আর্জেন্টিনায়, ইতালীয় অভিবাসনের প্রভাব সংস্কৃতিকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

সাধারণত ছয়টি বড় সাংস্কৃতিক অঞ্চল আলাদা করে দেখা হয়। প্রথমটি হলো মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। এসব দেশের মধ্যে যেমন মিল আছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও রয়েছে। এরপর আসে ক্যারিবীয় অঞ্চল, যার নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে; এর মধ্যে কিউবা, পুয়ের্তো রিকো ও ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যেও কয়েকটি বড় অঞ্চল আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। রিও দে লা প্লাতা অঞ্চল, যার মধ্যে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে রয়েছে, তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বহন করে। আন্দীয় দেশগুলো—পেরু, বলিভিয়া ও ইকুয়েডর আরেকটি গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে। কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা আবার চিলি কিছুটা আলাদা অবস্থানে রয়েছে। এসব বৃহৎ অঞ্চলের মধ্যে অসংখ্য পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়।

তবে অবশ্যই ভাষার কারণে এই অঞ্চলগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। আর এই পরিসরের মধ্যে নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ, সেখানে স্প্যানিশ ভাষাভাষীর সংখ্যা বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বেশি স্প্যানিশভাষী মানুষ আছে মেক্সিকোতে, এরপর যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া, স্পেন এবং অন্যান্য দেশে। প্যাটাগোনিয়া থেকে কানাডার সীমান্ত পর্যন্ত, এই পুরো বিস্তীর্ণ অঞ্চল স্প্যানিশ ভাষার মাধ্যমে একসূত্রে বাঁধা।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আর এসব অঞ্চলে কি স্প্যানিশ ভাষাও আলাদা? এমন হয় কি, একটি দেশে কোনো শব্দের এক অর্থ, আর অন্য দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ?

দারিয়া সিনিৎসিনা: অবশ্যই। এ জন্য বিশেষ অভিধান রয়েছে। এমনকি অভিধানে কিছু না পাওয়া গেলেও সাধারণত সেই দেশে বসবাসকারী মানুষদের সাহায্য নেওয়া যায়। যদিও কখনো কখনো এমনও হয় যে কেউই কোনো শব্দের অর্থ জানে না। কারণ, হয়তো সেটি ৫০ বছর আগে গুয়াতেমালার কোনো ছোট গ্রামে একবার ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে এমন ঘটনা বিরল।

বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যেসব দেশে স্প্যানিশ ভাষা রয়েছে, সেসব দেশে স্প্যানিশ ভাষা একাডেমির একটি নেটওয়ার্ক আছে, এমনকি ফিলিপাইনেও। এই একাডেমিগুলো যৌথভাবে নানা অভিধান প্রকাশ করে, যার মধ্যে অন্যতম বড় একটি হলো ‘আমেরিকানিজমের অভিধান’।

উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি এখন একটি আর্জেন্টাইন লেখা অনুবাদ করছি। সেখানে একজন মানুষকে বলা হয়েছে el ruso—আক্ষরিক অর্থে ‘রুশ’। কিন্তু প্রসঙ্গ, চরিত্রের বর্ণনা, নাম কিংবা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তা মোটেই মিলছিল না। আমার সন্দেহ হয়েছিল, শব্দটির হয়তো অন্য কোনো অর্থ আছে। পরে অভিধানে নিশ্চিত হলাম: আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়েতে আগে এভাবে ইহুদিদের ডাকা হতো।

এটি সম্ভবত এ কারণে যে উনিশ শতকের শেষ ভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে পূর্ব ইউরোপ থেকে সেখানে বহু অভিবাসী গিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ইহুদি। হয়তো তাঁদের উৎপত্তিস্থল বা চেহারার কারণে তাঁদের ‘রুশ’ বলা হতো। লেখাটিতে বলা হয়েছে, লোকটি খ্রিষ্টান নয়, তার নাম জ্যাক, সম্ভবত জাকারিয়া নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। ফলে বোঝা গেল, এখানে রুশ বলতে আসলে বোঝানো হয়েছে যে তিনি ছিলেন একজন ইহুদি।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আপনার মতে, সমকালীন লাতিন আমেরিকার কোন লেখকেরা আরও বেশি মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য?

দারিয়া সিনিৎসিনা: এখানে বিষয়টি হয়তো শুধু সমকালীনতার নয়; বরং সোভিয়েত আমলে আমরা অনেক লেখককে হারিয়ে ফেলেছি। কারণ, সব সাহিত্য আমাদের কাছে পৌঁছাত না। কিছু লেখককে সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হতো না কিংবা অন্য কোনো কারণে তাঁদের লেখা রুশভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি। অথচ তাঁরা প্রকৃতপক্ষে ক্লাসিক লেখক। এমন নাম বেশ কয়েকটি আছে।

উদাহরণ হিসেবে হোসে দোনোসোর কথা বলা যায়, ষাটের দশকের একজন চিলিয়ান লেখক, যার অসংখ্য অসাধারণ উপন্যাস রয়েছে। অথবা আলফ্রেদো ব্রাইসে এচেনিকে—একজন পেরুভিয়ান লেখক, যিনি আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় অনূদিতই হননি। এ ধরনের উদাহরণ আরও অনেক আছে।

আজকের সময়ের কথা বললে বিশ্বের অন্য জায়গার মতো লাতিন আমেরিকাতেও অনেক তরুণ লেখক আছেন। যেমন আধুনিক কিউবান সাহিত্য খুবই আকর্ষণীয়। তবে সমস্যা হলো, তরুণ কিউবান লেখকদের জন্য বৈশ্বিক সাহিত্যের বাজারে প্রবেশ করা কঠিন। অনেক সময় তাঁদের কাছে প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধাও থাকে না—কখনো বিদ্যুৎ নেই, কখনো ইন্টারনেট বন্ধ, কখনো অন্য কোনো সমস্যা। এসব বিষয়ও সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। কিন্তু পুরো অঞ্চলে এখন অসংখ্য আকর্ষণীয় সাহিত্যকর্ম তৈরি হচ্ছে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আধুনিক কিউবান লেখকেরা কি পার্টির আদর্শ মেনে লেখেন, নাকি সেখানে প্রচারণাবিহীন সাহিত্যও আছে?

দারিয়া সিনিৎসিনা: অবশ্যই আছে। আসলে কিউবার সরকার এই দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহনশীল। যদি কোনো লেখক সরাসরি না বলেন, ‘চলুন সবাই মিলে সরকার উৎখাত করি’, তাহলে সাহিত্যে সমালোচনার জায়গা মোটামুটি রয়েছে এবং তা প্রকাশও পায়।

এমন অনেক লেখক আছেন, যাঁরা সারা জীবন কিউবাতেই থেকেছেন, কোথাও যাননি; কিন্তু তবু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার কষ্ট ও সীমাবদ্ধতাগুলো খুব কঠোরভাবে বর্ণনা করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিউবা এখনো সেই ব্যবস্থার মধ্যে রয়ে গেছে।

মারিয়া সেদনিয়েভা: আর এ ধরনের সাহিত্য কি কিউবার সরকার সেন্সর করে না?

দারিয়া সিনিৎসিনা: সাধারণভাবে বলতে গেলে এখন আর আগের মতো নয়। একসময় বিদেশে প্রকাশনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল এবং সেন্সরশিপও ছিল অত্যন্ত কঠোর। লেখকদের নানা গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু অনেক বছর আগে, অন্তত নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই কিউবায় এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। আমার কিছু কিউবান লেখক বন্ধু আছেন, তাঁরা স্পষ্টভাবে সেই মুহূর্তটির কথা মনে করতে পারেন, যখন সংস্কৃতিমন্ত্রী তাঁদের ডেকে জানিয়েছিলেন যে এখন থেকে তাঁদের লেখা বিদেশে প্রকাশ করা যাবে।

উদাহরণ হিসেবে পেদ্রো হুয়ান গুতিয়েরেসের কথা বলা যায়। তিনি এমন এক ধারায় লেখেন, যাকে ‘ডার্টি রিয়ালিজম’ বলা হয়। তাঁর লেখায় সবকিছু খুব অন্ধকার, প্রায় নির্মম বাস্তবতার মতো করে তুলে ধরা হয়। তবু তাঁর বহু বই দেশে প্রকাশিত হয়েছে।

তাই বলা যায়, কিউবায় সেন্সরশিপ সম্ভবত প্রয়োজনমতো কাজ করে। কখনো কিছু বিষয় উপেক্ষা করা হয়, আবার কখনো সেন্সরশিপ কার্যকর হয় না।

রুশ পত্রিকা ‘জা রুবেঝোম’ বা ‘বইয়ের দুনিয়া’য় এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই পত্রিকায় এ রকম যে সাক্ষাৎকারগুলো ছাপা হয়েছে, সেগুলো ধারাবাহিকভাবে রুশ থেকে অনুবাদ করেছেন জাহীদ রেজা নূর

সেবা প্রকাশনী বন্ধ হয়নি, নতুন করে সাজাতে পুরোনোকে ভাঙছি: মাসুমা মায়মুর

টিকা কেনা নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ইউনূসের বিশেষ সহকারী

শক্তিশালী জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা খুবই জরুরি: রানা ফ্লাওয়ার্স

এক হাজার কিমি খাল খনন করা হবে ১৮০ দিনে: শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি

আমার অঙ্গীকার মাদক-সন্ত্রাস নির্মূল: অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

আমার লড়াই আমি চালিয়ে যাব: রুমিন ফারহানা

ভোট নিয়ে ভোটারদের মতো সন্দিহান আমিও

গবেষণা ফান্ড পাওয়ার বেশ কিছু উৎস আছে

ছোটখাটো শিল্পনগরী গড়ে তুলতে চাই মাদারীপুরে: আনিসুর রহমান তালুকদার

ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রতিহিংসা চাই না: ইয়াসের খান চৌধুরী