ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আর্থিক অনিয়মের দায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে যার একটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছিল, সেই কর্মকর্তা নয়না চৌধুরীকে গত ১৬ জুলাই শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এর আগে নয়না চৌধুরী একই দপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ২০১৮ সালের ২৯ জুলাইয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় একটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁকে চূড়ান্ত সতর্ক করা হয়।
জানা যায়, নয়না চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তে সিন্ডিকেট একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের তৎকালীন পরিচালক মো. শোকাতুর রহমান বলেন, ঘটনাটি ছিল তহবিল তছরুপের (আত্মসাৎ) একটি ইচ্ছাকৃত চেষ্টা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী চেক বই পরিচালক বা হিসাব বিভাগে থাকার কথা থাকলেও নয়না চৌধুরী তা নিজের কাছে রাখতেন। জুডো-কারাতে প্রশিক্ষকদের বকেয়া সম্মানী পরিশোধের জন্য উপাচার্যের অনুমোদিত নথিতে যে পরিমাণ অর্থ উল্লেখ ছিল, তিনি চেকে তার চেয়ে বেশি অঙ্ক লিখে স্বাক্ষরের জন্য উপস্থাপন করেন। অনুমোদিত নথি ও চেকের অঙ্কে অসামঞ্জস্য ধরা পড়ায় বিষয়টি উপাচার্যের নজরে আনা হয়। পরে সিন্ডিকেট তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তিনি আরও বলেন, এটি গুরুতর আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে শুধু একটি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিলের শাস্তি দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অতীতে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ থাকায় তৎকালীন পরিচালকের অনুপস্থিতিতেও নয়না চৌধুরীকে কখনো ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবে সম্প্রতি সাবেক পরিচালক দায়িত্ব ছাড়ার পর তাঁকেই পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়োগকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, পরিচালকের পদটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব এই পদের অধীনে থাকে। অতীতে আর্থিক অনিয়মে দণ্ডপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে এমন পদে নিয়োগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নয়না চৌধুরী বলেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘তাঁর একটি ইনক্রিমেন্ট বাতিল হয়েছিল, সেটি আমাদের জানা আছে এবং এ-সংক্রান্ত রিপোর্টও রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। এখানে সিনিয়রিটির কোনো ব্যত্যয় হয়নি।’
আর্থিক অনিয়মে দণ্ডপ্রাপ্ত কাউকে পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার বিধান আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। কর্তৃপক্ষ সিনিয়রিটি বিবেচনায় নিয়েই তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের আগের পরিচালক পদত্যাগ করায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতেই নয়না চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় সাবেক পরিচালকের পরেই তাঁর অবস্থান ছিল।
আর্থিক অনিয়মের রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তাঁকে এমন সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত—এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘তাঁর অপরাধের জন্য ইতিমধ্যেই শাস্তি কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বিচারাধীন নেই। অভিযোগ বিচারাধীন থাকলে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া যেত না। যেহেতু শাস্তি কার্যকর হয়েছে, তাই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’