সন্ধ্যায় বাড়িতে পূজা-অর্চনা শেষ করে পাশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন চানু বালা। কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশী গোলাপী রানীর চিৎকার শুনে জানতে পারেন, তাঁদের বাড়িতে আগুন লেগেছে। ছুটে এসে দেখেন, বসতঘর দাউ দাউ করে জ্বলছে। ঘরের ভেতরে বাঁধা গরু ও তিনটি ছাগল প্রাণ বাঁচাতে ছটফট করছে। কিন্তু আগুনের তীব্রতায় কাছে যাওয়ার উপায় নেই। চোখের সামনেই পুড়ে মারা যায় গবাদিপশুগুলো। একপর্যায়ে সংসারের সবকিছু পুড়ে যেতে দেখে জ্ঞান হারান চানু বালা।
আগুনে পুড়ে গেছে তাঁদের তিনটি ঘর, একটি গরু, তিনটি ছাগল, জমি কেনার জন্য জমানো তিন লাখ টাকা এবং মেয়ের বিয়েতে দেওয়া প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার। একই আগুনে তাঁর দেবর নরেশ চন্দ্র রায়ের একটি ঘরও পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, সব মিলিয়ে তাঁদের প্রায় আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের নবনীদাস মাঠের পাড় এলাকায় অশোক চন্দ্র রায় (৫০) ও তাঁর ছোট ভাই নরেশ চন্দ্র রায়ের বাড়িতে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, বসতঘরের জায়গায় পড়ে আছে পোড়া টিন, বাঁশ ও কাঠের অবশিষ্টাংশ। বাড়ির পাশে পোড়া টিন দিয়ে কোনোমতে তৈরি করা ছোট্ট একটি চালাঘরে রাত কাটিয়েছেন অশোক ও তাঁর স্ত্রী চানু বালা। চারদিকে পোড়া জিনিসপত্রের স্তূপ। যে উঠানে একসময় সংসারের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন শুধু ধ্বংসের চিহ্ন।
পোড়া বাড়ির উঠানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন চানু বালা। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘এতগুলা ঋণ ক্যামন করি পরিশোধ করিমো? মোর বেটির এই স্বর্ণ ক্যামন করি দিমো? সব শেষ হয়া গেল। ঘরে কিছুই তো নাই।’
অশোক চন্দ্র রায় এলাকায় ঘুরে ঘুরে নারকেল ও খেজুরগাছের ডাল কাটেন। বিভিন্ন বাগানে কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করেও সংসার চালান। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের তিন-চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে। ছেলে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন। ছেলের বিয়ের জন্য কিছু জমি কিনে বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল অশোকের। বাবার কাছ থেকে পাওয়া মাত্র দুই শতক জমির ওপরই ছিল তাঁদের বসতবাড়ি।
অশোক চন্দ্র রায় আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাপের কাছ থেকে দুই শতক জমি পাইছি। এইটুকু জমির ওপর কষ্ট করে বাড়ি করছি। ছেলে ঢাকায় থাকে। ছেলে বড় হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে। এ জন্য মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর কয়েক বছর ধরে কিস্তি নিয়ে, একটু একটু করে এলাকায় ঘুরে কাজকাম করে কিছু টাকা জমাইছিলাম। ভাবছিলাম, কিছু জমি কিনে বাড়ি করব, ছেলেকে বিয়ে দেব। কিন্তু আগুনে সব শেষ হয়ে গেল।’ কিছুদিন আগেও কিস্তিতে ৫০ হাজার টাকা তুলেছি সেখানেও এখন ৩০ হাজার টাকা পাবে।
মেয়ের বিয়ের সময় ধারদেনা করে প্রায় দুই লাখ টাকার স্বর্ণালংকার দিয়েছিলেন অশোক। মেয়ের সন্তান হওয়ার সময় সেই স্বর্ণালংকার মায়ের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। আগুনে সেগুলোও পুড়ে গেছে। এ বিষয়ে অশোক বলেন, ‘মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিন-চার বছর আগে। তখন ধারদেনা করে প্রায় দুই লাখ টাকার স্বর্ণ দিয়েছিলাম। মেয়ের বাচ্চা হওয়ার সময় সেই স্বর্ণগুলো ওর মা অর্থাৎ আমার স্ত্রীর কাছে রেখে গিয়েছিল। সেগুলোও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিছুই বাঁচাতে পারি নাই।’
অগ্নিকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী গোলাপী রানী বলেন, ‘সন্ধ্যায় ঘরের পূজাপাঠ শেষ করে বাইরে বের হইছি। দেখি, ঘরের টিনের চাল দিয়ে দাউ দাউ করে আগুন বের হচ্ছে। তখন চিৎকার দিই। আমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আগুন নেভানো যায়নি। ঘরে থাকা গরু-ছাগলগুলো গলা ফাটিয়ে ডাকতেছিল। পাশে দেয়াল থাকায় ভেতরে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিস আসার পর আগুন নিভেছে, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। মানুষটা পথে বসে গেল।’
স্থানীয় লোকজন আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। খবর পেয়ে গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে সরু ও চলাচলের অনুপযোগী রাস্তার কারণে তাঁদের পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। ততক্ষণে বসতঘর ও মালামালের বেশির ভাগই পুড়ে যায়। পরিবারের ধারণা, বাড়ির পূজার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার আরিফুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হই। এতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের পৌঁছানোর আগে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’
রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, ‘আমি রাতেই আগুন লাগার খবর শুনেছি। আজকে যাব, দেখি তাঁদের জন্য কিছু করতে পারি কি না।’