অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে লাথি মারার ঘটনায় গর্ভপাত হলেও মামলার মেডিকেল রিপোর্টে তা গোপন করে শুধু ‘পায়ে ঘষা’ লাগার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে মেডিকেল রিপোর্টে জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গৃহবধূ আশা আক্তারের (২১) স্বামী সালমান শাহ। তিনি এ ঘটনায় জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
শনিবার (১ আগস্ট) জেলা সিভিল সার্জন গোলাম মাওলা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে গত বুধবার অভিযোগটি দাখিল করেন সালমান শাহ।
অভিযোগকারী সালমান শাহ উপজেলার সুয়াইর গ্রামের মো. হাসিম উদ্দিনের ছেলে।
লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, গত ৩ জুন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ফেরদৌস মিয়া তাঁর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আশা আক্তারকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁর তলপেটে লাথি মারলে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে তাঁকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তি ও আলট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেন।
অভিযোগে বলা হয়, একই দিন একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আলট্রাসনোগ্রাফিতে তিন মাসের গর্ভধারণ এবং জীবিত ভ্রূণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে পরদিন অপর একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে ‘নরমাল স্টাডি’ উল্লেখ করা হয়। এতে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ফেরদৌস মিয়ার বিরুদ্ধে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা করা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ৫ জুন আশা আক্তারকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) জয় পাল মেডিকেল রিপোর্ট চেয়ে আবেদন করেন। ২৮ জুন রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও একদিন আগে ২৭ জুন একটি রিপোর্ট আদালতে পাঠানো হয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তাকেও তার একটি কপি দেওয়া হয়।
সালমান শাহর দাবি, ওই রিপোর্টে আঘাতজনিত গর্ভপাত বা আলট্রাসনোগ্রাফির কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। বরং শুধু ‘পায়ে ঘষা’ লাগার কথা লেখা হয়। ওই রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার পর অভিযুক্ত ফেরদৌস মিয়া জামিন পান।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জানালে ২ জুলাই নতুন করে একটি মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়া হয়। সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগের রিপোর্টটিকে ভুয়া এবং তাতে থাকা চিকিৎসকদের স্বাক্ষর জাল বলে জানায়।
সালমান শাহ প্রশ্ন তোলেন, যদি প্রথম রিপোর্টটি ভুয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি কীভাবে হাসপাতাল থেকে আদালত ও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাল। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অলক কান্তি তালুকদার বলেন, ‘প্রথম মেডিকেল রিপোর্টে আমার স্বাক্ষরসহ আরও দুই চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। আমি ওই রিপোর্টে কোনো স্বাক্ষর করিনি। বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
ভুয়া রিপোর্টে স্বাক্ষর রয়েছে বলে উল্লেখ করা অপর দুই চিকিৎসক পার্থ সেন ও ডা. মোস্তাফিজুর রহমানও জানান, তাদের স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমেনুল ইসলাম বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী মেডিকেল রিপোর্ট আমার মাধ্যমে ইস্যু হয় এবং তা রেজিস্ট্রারে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু প্রথম রিপোর্টের কোনো তথ্য রেজিস্ট্রারে নেই। ২ জুলাই নিয়ম মেনে নতুন রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। আগের রিপোর্টটি ভুয়া।’
জেলা সিভিল সার্জন গোলাম মাওলা বলেন, ‘অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’