পেট্রল ও অকটেন সংকটে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ আরিচা-কাজীরহাট নৌপথে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দ্রুত যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল হাজারো যাত্রী পড়েছেন ভোগান্তিতে। একই সঙ্গে আয় বন্ধ হয়ে বিপাকে পড়েছেন বোটচালক ও শ্রমিকেরা, আর লোকসানের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন মালিকেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯ এপ্রিল সকাল থেকে এ নৌপথে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর আগে কয়েক দিন সীমিত আকারে চললেও জ্বালানি সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন মালিকেরা।
এ নৌপথ চালু হওয়ার পর আরিচা ও কাজীরহাট ঘাটে ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। পাবনার সাঁথিয়া, বেড়া, ঈশ্বরদীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ সময় বাঁচাতে এ পথে ব্যবহার করতেন। স্পিডবোটে মাত্র ২০-২৫ মিনিটে নদী পার হওয়া যেত, যা যাত্রীদের কাছে দ্রুত ও সুবিধাজনক মাধ্যম ছিল।
বর্তমানে স্পিডবোট বন্ধ থাকায় যাত্রীদের ফেরি ও লঞ্চের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নদী পার হতে সময় লাগছে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বা তারও বেশি। ফেরি ছাড়তে বিলম্ব হওয়ায় অপেক্ষার সময় মিলিয়ে যাত্রা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে। আগে যেখানে কাজীরহাট থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায়।
পাবনা থেকে আসা যাত্রী মীর মোশারফ বলেন, ‘স্পিডবোট থাকলে ২০ মিনিটেই নদী পার হওয়া যেত, এখন ফেরিতে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লাগছে।’
আরেক যাত্রী মুনসুর মিয়া বলেন, ‘সময় বাঁচাতে স্পিডবোটে যাতায়াত করতাম। এখন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
স্পিডবোট বন্ধ থাকায় ফেরি ও লঞ্চে যাত্রী চাপও বেড়েছে। এতে দুর্ভোগের পাশাপাশি যাতায়াতের সময়ও দ্বিগুণের বেশি লাগছে।
বোটের মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, এ নৌপথে ১৪০টির বেশি স্পিডবোট রয়েছে। প্রতিদিন রোটেশন পদ্ধতিতে প্রায় ৩০টি বোট চলাচল করত, যার জন্য ৮০০ থেকে ১০০০ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হতো। কিন্তু বর্তমানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় বোট চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
স্পিডবোটের মালিক আবু সাইয়ীদ বলেন, ‘২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বোট কিনেছি। এখন জ্বালানি না থাকায় বসে থাকতে হচ্ছে, প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
আরেক মালিক রুবেল মিয়া জানান, আগে শিবালয়ের চারটি ফিলিং স্টেশন থেকেই জ্বালানি পাওয়া যেত, এখন সেই সরবরাহ নেই।
কর্মহীন হয়ে পড়া চালক-শ্রমিকদের অবস্থাও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চালক করিম মিয়া বলেন, ‘দৈনিক আয়ে সংসার চলত, এখন কাজ না থাকায় বিপদে পড়েছি।’
চালক শাহিন মিয়া বলেন, ‘প্রতি ট্রিপে ৫০০ টাকা পেতাম, এখন পুরোপুরি বেকার।’
আরিচা স্পিডবোট মালিক সমিতির সভাপতি রহমত আলী লাভলু ব্যাপারী বলেন, জ্বালানি সংকটে সব স্পিডবোট বন্ধ রয়েছে। এতে মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, তেলের পাম্পগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে স্পিডবোট চলাচল পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন যাত্রী, মালিক ও শ্রমিকেরা। তাঁদের মতে, এই নৌপথে সচল না থাকলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।