‘আগে সংসারের প্রয়োজনে দু-একটা গরু পালন করতাম। এখন গরুই আমাদের ব্যবসা, গরুই আমাদের ভবিষ্যৎ’—কথাগুলো জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার মাঝিনা-আটাপুর গ্রামের খামারি অভিজিতের। প্রায় এক যুগ আগে ৮-১০টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করা তাঁর খামারে এখন ২৫টি গরু। আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে পাঁচটি ষাঁড় বিক্রির প্রস্তুতির কথা জানান অভিজিৎ।
শুধু পাঁচবিবি নয়, জেলার কালাই, ক্ষেতলাল, আক্কেলপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এখন গরু মোটাতাজাকরণ একটি সম্ভাবনাময় গ্রামীণ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। একসময় মৌসুমি প্রস্তুতি হিসেবে কোরবানির পশু পালন করা হলেও বর্তমানে তা অনেকের কাছে লাভজনক উদ্যোক্তা কার্যক্রম। ছোট-বড় হাজারো খামারকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক চক্র, বদলে যাচ্ছে গ্রামের জীবনযাত্রা।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জয়পুরহাটে প্রায় ২৬ হাজার খামারে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৫৩টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার চাহিদা প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার, বাকিগুলো অন্য জেলায় সরবরাহ করা হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মহির উদ্দিন বলেন, ‘স্থানীয় খামারিরা এখন প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এতে নিরাপদ মাংস উৎপাদনের পাশাপাশি খামারিরাও লাভবান হচ্ছেন।’
পাঁচবিবির সরাইল-মোহাম্মদপুর এলাকার এ এন মহি উদ্দিনের খামারে ১২০টি গরু রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১০-১২টি গরু কোরবানির বাজারে বিক্রি হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা গরুকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়াই। ঘাস, ভুট্টা, খৈল—এসব দিয়েই গরু বড় করি।’
একইভাবে কালাই উপজেলার পাঁচশিরা এলাকার খামারি আলী আনছারও গড়ে তুলেছেন সফল খামার। আগে চাতাল ব্যবসা করলেও ২০১৫ সাল থেকে গরু পালন শুরু করেন। পাঁচটি গরু দিয়ে শুরু করা তাঁর খামারে এখন ১৯টি গরু। এগুলোর মধ্যে ৮টি গাভি প্রতিদিন ৭০-৮০ লিটার দুধ দেয়। আনছার বলেন, ‘দুধ বিক্রির টাকাতেই গরুর খাবারের খরচ উঠে যায়। পরে বাছুর বড় হলে সেগুলো বিক্রি করে ভালো লাভ হয়।’
কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার মহিলা খামারি ছালেমা খাতুন জানান, তাঁর খামারে সারা বছর ছয়-সাতটি গরু থাকে। আর প্রতিবছর অন্তত দুটি গরু বিক্রিও করেন তিনি। গরু লালন-পালন করেই ইটের বাড়ি ও ফার্ম তৈরি করেছেন। গরু পালনের লাভ থেকে তিনি পাঁচ-ছয় বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন। মেয়ে এবং ছেলেকে পড়িয়েছেন, তাঁদের বিয়েও দিয়েছেন। স্বাচ্ছন্দ্যে কাটছে তাঁর দিন।
গরুর খামার ঘিরে এখন গ্রামে গড়ে উঠেছে বহুমুখী উপ-অর্থনীতি। গোখাদ্য বিক্রেতা, পশুচিকিৎসক, শ্রমিক, বাঁশ-দড়ি ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক—অনেকে এই মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
কালাই উপজেলার গোখাদ্য ব্যবসায়ী জালাল উদ্দীন বলেন, ‘কোরবানির সময় খাদ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বাড়ে। তখন আমাদের ব্যবসাও জমে ওঠে।’
খামারকেন্দ্রিক এই অর্থনীতিতে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন বেকার যুবকেরাও। অনেকে বিদেশফেরত সঞ্চয় কিংবা ব্যাংকঋণ নিয়ে খামার গড়ে তুলছেন।
ক্ষেতলাল উপজেলার তারাকুল গ্রামের খামারি হাশেম আলী বলেন, ‘আমাদের ছোট খামার। চার-পাঁচটি গরু আছে। সহজ শর্তে ঋণ পেলে খামার বড় করা সম্ভব।’
ঐতিহ্যবাহী নতুনহাট ও পাঁচবিবি পশুর হাট ঘিরেও এখন বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। স্থানীয় খামারের দেশি ষাঁড়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
গরু ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে বাইরের জেলা থেকে প্রচুর পশু আসত। এখন স্থানীয় খামারের গরুই বাজার দখল করছে। এতে জেলার টাকাও জেলায় থাকছে।’
হাট ইজারাদার নজরুল ইসলাম জানান, কোরবানির হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার জন্য নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও পশু পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, জেলার ১০টি স্থায়ী ও ১৭টি অস্থায়ী পশুর হাটে ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা থাকবে। এ জন্য ১৩টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে কাজ করবে।
খামারিরা বলছেন, মাঝারি আকারের একটি গরু পালনে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি হয় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায়। ফলে সঠিক বাজার পেলে লাভের সম্ভাবনাও ভালো। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। খাদ্যের দাম বাড়া, রোগব্যাধির ঝুঁকি, বাজারে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং সহজ শর্তে ঋণের অভাব খামারিদের বড় উদ্বেগ।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার করিমনগরের খামারি আনিসুর রহমান বলেন, ‘কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু পালনেই এখন বেশি লাভ। তবে খাদ্যের দাম কম হলে লাভ আরও বাড়ত।’
কালাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কোরবানির পশু উৎপাদন এখন কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা অর্থনীতির বড় খাত। এটি শুধু পশুপালন নয়, পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থানীয়ভাবে কোরবানির পশু উৎপাদন বাড়লে বাইরের জেলার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং অর্থ গ্রামেই আবর্তিত হবে। এতে শক্তিশালী হবে স্থানীয় বাজারব্যবস্থা।
কালাই সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘পশুপালননির্ভর অর্থনীতি পরিবারে নগদ অর্থ প্রবাহ বাড়াচ্ছে। যুবকদের উদ্যোক্তা করছে, নারীদের সম্পৃক্ত করছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনের বড় উদাহরণ।’