ঈদুল আজহার এক সপ্তাহ পার হলেও চামড়ার হাটে ক্রেতার দেখা নেই। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিক্রির আশায় পশুর চামড়া নিয়ে দিনভর বসে থেকে হতাশ হয়ে পড়ছেন। চামড়ার ব্যবসায় বড় লোকসানের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার কালীবাড়ী হাট। গত বুধবার হাটের দিন দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যানে করে চামড়া নিয়ে আসছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। পর্যাপ্ত পরিমাণ চামড়া নিয়ে তাঁরা হাটে বসেছেন। কিন্তু ক্রেতার আনাগোনা নেই। দু-একজন পাইকার ও ট্যানারি প্রতিনিধি থাকলেও তাঁরা যৎসামান্য মূল্য বলছেন। বেচাবিক্রি না হওয়ায় অনেকে চামড়ার স্তূপ হাটেই ফেলে যাচ্ছেন। এদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হাট ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়ে।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে তাঁরা এমনিতেই হতাশ। সরকার-নির্ধারিত মূল্যে বাজারে চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না তাঁরা। কিছু বিক্রি হলেও অনেক কম দাম পেয়েছেন। হাট বসার আগের রাত থেকে অনেকে চামড়া নিয়ে এসেছেন। কিন্তু ক্রেতা মিলছে না।
কোরবানির পর কালীবাড়ী হাটে গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলা থেকে চামড়া নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। এ হাট থেকে ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা চামড়া কিনে নিয়ে যান। এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রংপুরের শঠিবাড়ীর চামড়া ব্যবসায়ী আনারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরে এই হাটে চামড়া ব্যবসা করছি। চার বছর ধরে লস (লোকসান) খাচ্ছি। গত বছর ঋণ করে চামড়া কিনে লস খেয়েছি। এ বছর ধারদেনা করে চামড়া কিনছি লাভের আশায়। সরকার যে রেট দিছে, ভাবছিলাম এবার লাভ হবে। কিন্তু এবার তো কেনা দামের অর্ধেকেও কেউ নিচ্ছে না।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী তারা মিয়া বলেন, ‘বাজারে আয়াই ব্যাপারীরা জোট কইরা ফেলায় হামারে চামড়ার দামই কচ্ছে না। জুতার দাম এত, চামড়ার দাম সস্তা কেন? এক জোড়া জুতার দাম ১ হাজার টাকা, ৫ হাজার টাকা। আর হামারের চামড়ার ন্যায্যমূল্য নেই। সবাই সিন্ডিকেট করে গরিবের পেটে লাত্থি মারে।’
জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার পুনুট থেকে আসা সাবু মিয়া বলেন, ‘এই হাটে ২২ বছর ধরে চামড়ার মৌসুমি ব্যবসা করি। অন্যান্য বছর হয় লাভ হইছে নয়তো আসল টাকা উঠছে। এবার চামড়া নিয়ে বড় লোকসানের মুখে পড়েছি।’
আরেক চামড়া ব্যবসায়ী সুনীল চন্দ্র বলেন, ‘বাজার জমবে মনে করে মাল নিয়ে হাটে আসছি। কিন্তু ব্যাপারীরা আসলো না। এখন আমরা চামড়া কী করমো।’
স্থানীয় পাইকার এরশাদ আলী বলেন, ‘এ বছর হাটে পাইকার তেমন নাই। প্রত্যেক বছর ঢাকা থেকে ট্যানারির মহাজনেরা এই হাটে এসে চামড়া কিনতেন। শুনতেছি, গত বছর নাকি তাঁরা কোটি কোটি টাকা লস খাইছেন। এ জন্য এবার তাঁরা চামড়া কিনছেন না। আমরা ঘুরে দু-চারটা ভালো মানের চামড়া কিনছি। কিনেই কী করব? ট্যানারি মালিকেরা যে সিন্ডিকেট। যদি বেচতে না পারি, সাহস হচ্ছে না।’
ট্যানারি মালিক ও পাইকার না আসায় হাট জমেনি জানিয়ে হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম নান্নু বলেন, ‘আমরা ট্যানারি মালিকদের আহ্বান জানিয়েছি এখানে এসে চামড়া কেনার জন্য, যাতে চামড়া ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পান। ট্যানারিরা একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এখানে চামড়ার মূল্য একেবারে কমিয়ে দেয়। এতে প্রান্তিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গত বছরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। এইবার সরকারের ঠিক করে দেওয়া মূল্য দিয়ে ট্যানারি মালিকেরা চামড়া কিনবেন বলে আমরা আশা করছি।’
চামড়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শাহিন আলম বলেন, ‘বাইরের দেশে চামড়া রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর কোটি কোটি টাকা লস খাওয়ায় চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না কোম্পানি। হাটে ঘুরছি, কোম্পানিকে রেট বলে দিচ্ছি, এখনো কেনার সংকেত পাই নাই।’
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় কোনো সিন্ডিকেটের কবলে ব্যবসায়ীরা যেন না পড়েন, সে ব্যাপারে মনিটরিং করা হবে। শুনেছি, বাজারে চামড়ার দাম অনেক কম। এ ছাড়া জেলায় সরকারিভাবে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুঁজি হারাবেন। ঢাকায় যেসব ট্যানারি মালিক রয়েছেন, তাঁদের এই হাটে এসে চামড়া কেনার আহ্বান করছি।’